একটি পুরোনো লোহার সিন্দুক। আধুনিক আসবাবপত্রের ভিড়ে সিন্দুকটির কার্যকারিতা বহু আগেই হারিয়েছে। তবুও সিন্দুকটি পরম যত্নে ঘরের এক কোণে রেখে দিয়েছিল সিরাজগঞ্জের কামারখন্দের এক পরিবার। তাদের কাছে এটি কেবল লোহার তৈরি কোনো বাক্স ছিল না; এটি ছিল বাবা-মায়ের স্মৃতি, পারিবারিক ইতিহাস আর ফেলে আসা সময়ের এক নীরব সাক্ষী।
২০১৮ সালে মৃত্যুর আগে এই সিন্দুকের ভেতরেই কয়েক হাজার টাকা রেখে গিয়েছিলেন মা মৌলুদা বেগম। তাঁর মৃত্যুর পর বিগত আট বছর ধরে মায়ের হাতের ছোঁয়া লেগে থাকা সেই টাকাগুলোতে হাত দেননি সন্তানেরা। কিন্তু আজ সোমবার ভোরের দিকে একদল চোর কেবল সেই সিন্দুকের তালাই ভাঙেনি, ভেঙে দিয়েছে একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের লালিত আবেগের সুরক্ষাবলয়ও।
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার রসুলপুর গ্রামে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মনিরুল ইসলাম ও তাঁর ভাই মাহমুদুল হাসানের যৌথ বাড়িতে এই চুরির ঘটনা ঘটে।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, চুরি যাওয়া অর্থের চেয়েও মায়ের শেষ স্মৃতি এভাবে নষ্ট হওয়ায় তাঁরা বেশি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।
রসুলপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী শিক্ষক মনিরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘মা মৃত্যুর আগে যেভাবে টাকাগুলো রেখে গিয়েছিলেন, আমরা সেভাবেই রেখে দিয়েছিলাম। মায়ের স্মৃতি হিসেবে আমরা কেউ কখনো সেই টাকা স্পর্শ করিনি। চোর এসে সেই লোহার সিন্দুক ভেঙে টাকাগুলো নিয়ে গেল।’
সিন্দুকটির বয়স এবং এর পেছনের ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ। মনিরুল ইসলাম তাঁর শৈশবের স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘আমার বয়স যখন মাত্র পাঁচ কি সাত বছর, তখন বন্যার সময় বাবা এক হিন্দু পরিবারের কাছ থেকে সিন্দুকটি কিনেছিলেন। এরপর নৌকায় করে সেটি বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেই থেকে সিন্দুকটি আমাদের পরিবারের সুখ-দুঃখের অংশ হয়ে আছে।’
মনিরুল ইসলামের বাবা আলী আশরাফ মণ্ডল মারা যাওয়ার পর, ২০১৮ সালে মা মৌলুদা বেগমও মারা যান। এরপর থেকে বাবা-মায়ের স্মৃতি আগলে রাখতেই সিন্দুকটি আগের জায়গায় রেখে দিয়েছিলেন ভাইয়েরা।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ভোরের দিকে একদল চোর জানালার গ্রিল কেটে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে। চোরেরা আলমারি ও ড্রয়ার ঘেঁটে মূল্যবান জিনিসপত্র ও নগদ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ঘরের কোণে থাকা পুরোনো সিন্দুকটির তালাও ভেঙে ফেলে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম বিষয়টি টের পান মাহমুদুল হাসানের স্ত্রী আঁখি খাতুন। তিনি দরজার নিচের অংশ ভাঙা এবং জানালার গ্রিল কাটা দেখতে পান। ঘরে ঢুকে দেখেন ঘরের কাপড়চোপড় ও আসবাবপত্র এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে।
আখি খাতুন বলেন, ‘আমার শাশুড়ির জমানো সেই পুরোনো সিন্দুক ভেঙে নগদ সাত-আট হাজার টাকা নিয়ে গেছে চোরেরা। এ ছাড়া ঘর থেকে এক ভরি চার আনা ওজনের একটি স্বর্ণের চেইনও চুরি হয়েছে। সব মিলিয়ে আমাদের প্রায় আড়াই লাখ টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে।’
ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ আড়াই লাখ টাকা হলেও পরিবারের কাছে মায়ের রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতির তুলনায় এই ক্ষতি অনেক বড়। বহু বছর ধরে সিন্দুকটি যে পারিবারিক আবেগের ভার বহন করে আসছিল, এখন তা ভাঙা তালা আর ছিন্নভিন্ন স্মৃতির ক্ষত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঘরের কোণে।