সবার হাতে জ্বলছে মোমবাতি, কণ্ঠে প্রার্থনার সুর। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা ও উঁচু-নিচু প্রায় দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এগিয়ে চলেছেন হাজারো মানুষ। তাঁদের হাতে জ্বলতে থাকা মোমবাতির আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে চারপাশ। শোভাযাত্রা শেষে মা মারিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করেন খ্রিষ্টভক্তরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার গারো পাহাড়ের ঢালে বারোমারী সাধু লিওর ধর্মপল্লিতে ফাতেমা রানীর তীর্থোৎসব উপলক্ষে এ আলোক শোভাযাত্রা বের করা হয়। এতে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার খ্রিষ্টভক্ত অংশ নেন। তাঁদের হাতে জ্বলতে থাকা মোমবাতির আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে গারো পাহাড়।
দুই দিনব্যাপী ফাতেমা রানীর তীর্থোৎসব আজ শুক্রবার শেষ হচ্ছে। ভারত সীমান্তঘেঁষা বারোমারী সাধু লিওর ধর্মপল্লিতে এবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে তীর্থোৎসবের ২৯তম আয়োজন। প্রতিবছর অক্টোবর মাসের শেষ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এ ধর্মীয় উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খ্রিষ্টভক্তদের পাশাপাশি অন্য ধর্মাবলম্বীরাও অংশ নেন। এবারের তীর্থোৎসবের প্রতিপাদ্য ‘মানবতার জননী: ফাতেমা রানী মা মারিয়া’।
গতকাল বিকেল ৪টায় পবিত্র খ্রিষ্টযাগের মধ্য দিয়ে তীর্থোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। রাত ৮টার দিকে বের করা হয় আলোক শোভাযাত্রা। রাত ১১টার দিকে মা মারিয়ার মূর্তি সামনে রেখে বিশাল প্যান্ডেলে অনুষ্ঠিত হয় আরাধ্য সাক্রামেন্টের আরাধনা। এরপর মধ্যরাতে নিরাময় অনুষ্ঠান ও নিশি জাগরণের মধ্য দিয়ে প্রথম দিনের ধর্মীয় কার্যক্রম শেষ হয়।
আজ সকাল ৮টায় জীবন্ত ক্রুশের পথ এবং সকাল ১০টায় মহাখ্রিষ্টযাগের মধ্য দিয়ে দুই দিনব্যাপী এ তীর্থোৎসবের সমাপ্তি হবে।
আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা যায়, ১৯৪২ সালে প্রায় ৪২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় বারোমারী সাধু লিওর ধর্মপল্লি। ১৯৯৮ সালে ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের প্রয়াত বিশপ ফ্রান্সিস এ গমেজ এ ধর্মপল্লিকে ‘ফাতেমা রানীর তীর্থস্থান’ হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর থেকে প্রতিবছর এখানে তীর্থোৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
তীর্থোৎসবে উপস্থিত ছিলেন শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন, পুলিশ সুপার এ কে এম জহিরুল ইসলামসহ স্থানীয় ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তায় একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পুলিশ, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), এপিবিএন, বিজিবি, আনসার, ফায়ার সার্ভিস, গ্রাম পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকেরা দায়িত্ব পালন করেন।
ঢাকা থেকে আসা পুণ্যার্থী উপমা চিসিম বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, মা ফাতেমা রানী এখানে জাগ্রত আছেন। এ জন্য দূরদূরান্ত থেকে আসি। তাঁকে ভক্তি ও সম্মান করি। মনের ইচ্ছা ও বাসনা জানিয়ে মানত করি। সেগুলো পূরণ করেন তিনি।’
হল্যান্ডের অধিবাসী ব্রাবিজিও বলেন, ‘এই স্থানটি আমার খুবই প্রিয়। আমি অনেকবার এখানে এসেছি। ঈশ্বরের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতেই এখানে আসা।’
তীর্থোৎসবের সমন্বয়কারী রেভারেন্ট ফাদার তরুণ বনোয়ারি বলেন, ‘এবারের তীর্থোৎসবে ধর্মীয় চেতনায় দেশি-বিদেশি প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার খ্রিষ্টভক্ত অংশ নিয়েছেন। এ আয়োজনের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’
শেরপুরের পুলিশ সুপার এ কে এম জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘তীর্থোৎসব উপলক্ষে ৪০০-এর বেশি পুলিশ ও এপিবিএন সদস্যসহ জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। সীমান্ত এলাকা হওয়ায় বিজিবিও দায়িত্ব পালন করছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুরো ধর্মপল্লি গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে।’