টানা বৃষ্টিতে রংপুর নগরীতে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। রাস্তা তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পানি ঢুকে পড়েছে ঘরবাড়িতে। নোংরা পানিতে দুর্ভোগ চরমে উঠেছে বাসিন্দাদের। কোনো কোনো বাড়িতে ডুবে গেছে চুলা। চৌকির ওপর বিকল্প চুলা বসিয়ে চলছে রান্নাবান্না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রংপুর নগরীর এই অবস্থা শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং অপরিকল্পিত নগর উন্নয়নের ফল।
রংপুর আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শনিবার সকাল থেকে পূর্ববর্তী গত ২৪ ঘণ্টায় রংপুরে ৬৮ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আর গত ২৫ এপ্রিল থেকে গতকাল ২ মে পর্যন্ত ২৫৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এতেই সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা।
গতকাল নগর ঘুরে দেখা যায়, বাবুখা, কামারপাড়া, শান্তিবাগ, গোমস্তপাড়া, কেরানীপাড়া, মূলাটোল, নিউ ইঞ্জিনিয়ারপাড়া, মুন্সিপাড়া, জুম্মাপাড়া, হনুমানতলা, এরশাদ মোড়সহ বেশ কয়েকটি এলাকায় সড়ক ও ঘরবাড়িতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নালার নোংরা পানি ঘরে ঢুকে গেছে। অনেকে চৌকির ওপরে রান্না করছেন।
কামারপাড়া এলাকার বাসিন্দা মৌসুমী বেগম বলেন, ‘টানা বৃষ্টি হলেই ঘরে পানি ঢোকে। রান্নাঘর থেকে শোয়ার ঘর—সবখানেই হাঁটুসমান নোংরা পানি জমে থাকে। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে চরম দুর্ভোগ হচ্ছে, অনেক সময় রান্নাবান্নাও করা সম্ভব হয় না।’
শান্তিবাগ এলাকার আরেক নারী হাসিনা খাতুন বলেন, ‘ঘরের আসবাব নষ্ট হচ্ছে, কাপড়চোপড় ভিজে যাচ্ছে। অসুস্থ মানুষদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি কষ্টে থাকতে হচ্ছে। আমরা দ্রুত এই সমস্যার সমাধান চাই।’
জানা যায়, জলাবদ্ধতা দূর করা এবং ম্যালেরিয়ার হাত থেকে রংপুরকে মুক্ত রাখতে পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান ও ডিমলার রাজা জানকী বল্লভ সেন ১৮৯০ সালে তাঁর মা চৌধুরানী শ্যামাসুন্দরী দেবীর নামে খালটি পুনঃখনন করেন। ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল নগরীর কেলাবন্দের ঘাঘট নদ থেকে শুরু যুক্ত হয়েছে মাহিগঞ্জের মরা ঘাঘটে। এলাকাভেদে এর প্রস্থ ২৩ থেকে ৯০ ফুট ছিল। বর্তমানে শ্যামাসুন্দরী দখল-দূষণের কারণে মৃতপ্রায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রংপুর নগরীর এই অবস্থা শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং অপরিকল্পিত নগর উন্নয়নের ফসল। শ্যামাসুন্দরী খাল একসময় শহরের প্রধান জলাধার ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও বর্তমানে তা দখল, দূষণ ও ভরাটের কারণে অকেজো হয়ে পড়েছে। খালের যথাযথ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। পানি চলাচলের পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে।
রংপুর সিটি করপোরেশনের (রসিক) নগর-পরিকল্পনাবিদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘রংপুর সিটি করপোরেশনের ড্রেনের ব্যবস্থা নিয়ে কোনো মাস্টারপ্ল্যান নেই। ফলে এমনটা হয়েছে। সামনে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আসছে। তারা একটা পরিকল্পনা করলে একটা সমাধানে আসবে।’
এই পরিস্থিতিতে রংপুর আবহাওয়া অফিস থেকে আরও বৃষ্টির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এই অফিসের ইনচার্জ মোস্তাফিজার রহমান বলেন, ‘৪ মে পর্যন্ত এভাবে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।’
এতে দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে ধারণা করছেন সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা। রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রাকিব হাসান বলেন, ‘রংপুর সিটি করপোরেশন নিয়ে আগে কোনো মাস্টারপ্ল্যান ছিল না। ইতিমধ্যে বুয়েটকে দিয়ে একটা প্ল্যান নেওয়া হয়েছে। দুজন অধ্যাপক এলাকা পরিদর্শন করেছেন। খুব দ্রুতই এই সমস্যার সমাধান হবে আশা করি।’ তিনি বলেন, ‘কিছু জায়গায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে বলে খবর পেয়েছি। সে জায়গাগুলোয় সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের লোক গেছে। দীর্ঘমেয়াদি একটা পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’