রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার হাজীপুর গ্রামের গোলজার হোসেন (৫০) একসময় অভাবের তাড়নায় দিনমজুরি করতেন। এখন তিনি এলাকায় পরিচিত ধানখেতে মাছ চাষের সফল উদ্যোক্তা হিসেবে। তিনি শুধু নিজের ভাগ্যই বদলায়নি, তাঁর দেখানো পথে সচ্ছলতা এসেছে গ্রামের আরও অনেক পরিবারে। স্থানীয়রা গুলজারকে এখন ধানখেতে মাছ চাষের ‘গুরু’ বলেই চেনেন।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের ইকরচালী ইউনিয়নের হাজীপুর গ্রামে এখন ধানখেতেই মাছ চাষের দৃশ্য চোখে পড়ে। সবুজ ধানের মাঝখানে জমে থাকা পানিতে বিভিন্ন জাতের মাছ করেন কৃষকেরা। ধান ও মাছের এই সমন্বিত চাষ এখন গ্রামের পরিচিত কৃষিপদ্ধতি।
গোলজার হোসেন জানান, ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি মেজ। বাবার অভাবের সংসার, তাই লেখাপড়া করা হয়নি। ১৯৯৮ সালে বিয়ে করেন পাশের হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের কুঠিয়ালপাড়া গ্রামের তোফাজ্জল হোসেনের মেয়ে নীলুফা বেগমকে। বিয়ের পর পরিবার তাঁকে আলাদা করে দিলে সংসারে দেখা দেয় অভাব। ২০০৫ সালে কুঠিয়ালপাড়া গ্রামের এনামুল হক তাকে ধানখেতে মাছ চাষের পরামর্শ দেন। এক একর জমি বর্গা নিয়ে বোরো ধানের খেতে মাছের চাষ করেন তিনি। প্রথম বছরেই ধান ও মাছ বিক্রি করে খরচ বাদে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা লাভ হয়। এরপর পুরোপুরি ধানখেতে মাছ চাষ ও জমির আইলে লিচু চাষে লেগে পড়েন তিনি। প্রথম বছরের লাভের টাকা দিয়ে পরের বছরে দুই একর জমি বর্গা নেন। সেবার ধান ও খেতের মাছ বিক্রি করে আয় করেন তিন লাখ টাকা। এভাবে একপর্যায়ে চাষের জমি বাড়ে, আয় বাড়ে। দিনমজুর থেকে গোলজার হয়ে ওঠেন সফল চাষি। কেনেন তিন একর জমি, তৈরি করেন পাকা বাড়ি। এখন তাঁর চার সন্তান লেখাপড়া করছে। এবার পাঁচ একর জমিতে ধানখেতে মাছ চাষ করেছেন তিনি। এর মধ্যে দুই একর জমি থেকে ইতিমধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকার ধান ও মাছ বিক্রি করেছেন। বাকি জমি থেকে আরও পাঁচ লাখ টাকার বেশি আয় হবে বলে আশা করছেন।
গোলজারের সফলতায় অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রামের অনেকেই ধানখেতে মাছ চাষ শুরু করেছেন। একসময় দিনমজুর হিসেবে পরিচিত মফিজার রহমান এখন নিজের জমিতে ধান ও মাছ চাষ করছেন। আবুজার হোসেনও এই পদ্ধতিতে সফল হয়ে পুকুর, হাঁসের খামার ও গবাদিপশুর খামার গড়ে তুলেছেন।
গ্রামের শিক্ষিত যুবক মজিদুল হক বলেন, ‘ধানখেতে মাছ আর হাঁসের সমন্বিত চাষ করছি। মাছের খরচেই ধান চাষ হয়ে যায়। এতে লাভও বেশি।’
গোলজার হোসেনের মতে, যে জমিতে অন্তত তিন ইঞ্চি পানি ধরে রাখা যায়, সেখানে মাছ চাষ সম্ভব। জমির চারপাশের আইল উঁচু করতে হয় এবং ধান রোপণের ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে মাছের পোনা ছাড়তে হয়। শিং, মাগুর, তেলাপিয়া, রুই, কাতলা ও সিলভার কার্প চাষে ভালো লাভ পাওয়া যায়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীবা রানী রায় বলেন, ‘ধানখেতে মাছ চাষে ধানের ফলন বাড়ে এবং কীটনাশকের ব্যবহার কমে।
এতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকে।’ উপজেলা সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, গোলজার হোসেন এই এলাকার মডেল কৃষক। তাঁর দেখানো পথে এখন অনেকেই ধানখেতে মাছ চাষ করছেন। এতে স্থানীয়ভাবে মাছের উৎপাদনও বাড়ছে।