রাজশাহীর কাঁকনহাট কলেজের তহবিলের ৮৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বরখাস্ত হয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. সুজাউদ্দীন। কিন্তু এরপরও তিনি কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি পরিবর্তনের জন্য অবৈধভাবে কলেজের প্যাড ব্যবহার করে নিজ স্বাক্ষরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন সভাপতিও নিয়োগ হয়েছে। এখন নতুন সভাপতির মাধ্যমে কলেজে ফিরতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন সুজাউদ্দীন।
এই অবস্থায় কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর মাঝে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। আজ বুধবার দুপুরে কাঁকনহাট বাজারে কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বিএনপির যৌথ উদ্যোগে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। কর্মসূচি থেকে কলেজের নতুন সভাপতি সারোয়ার জাহানের নিয়োগ বাতিল ও বরখাস্ত করা অধ্যক্ষ সুজাউদ্দীনের শাস্তি দাবি করা হয়।
মানববন্ধনে কাঁকনহাট কলেজের দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুস সোবহান, কাঁকনহাট পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিম আহমেদ, পৌর যুবদলের সভাপতি মশিউর রহমান, গভর্নিং বডির অভিভাবক সদস্য আব্দুল কুদ্দুস, শিক্ষক প্রতিনিধি নাদিরা খাতুন প্রমুখ বক্তব্য দেন।
মানববন্ধনে কলেজের শিক্ষকেরা অভিযোগ করেন, ২০১৬ সালে মো. সুজাউদ্দীন অধ্যক্ষ হয়ে আসার পর থেকে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, নিয়োগ-বাণিজ্য ও কলেজের গচ্ছিত অর্থ আত্মসাৎ করতে থাকেন।
সর্বশেষ তিনি কলেজের গচ্ছিত তহবিলের প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে জাল স্বাক্ষরে উত্তোলন করেছেন। কলেজের অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটির নিরীক্ষায় বিভিন্ন খাত থেকে অধ্যক্ষ প্রায় ৮৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে ধরা পড়েছে।
এই আর্থিক কেলেঙ্কারি ধরা পড়ার পর গত বছরের ১২ অক্টোবর কলেজ গভর্নিং বডির তৎকালীন সভাপতি আব্দুল হান্নান তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। আর অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও একটি অডিট টিম গঠন করেছে। কিন্তু সাময়িক বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ এই নিরীক্ষা কমিটির কার্যক্রম আটকে রেখেছেন।
মানববন্ধনে বক্তারা জানান, বরখাস্ত অধ্যক্ষ সুজাউদ্দীন কলেজে পুনর্বহাল হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তিনি বরখাস্ত থাকা অবস্থায় কলেজের বিদ্যমান গভর্নিং বডি ও শিক্ষকদের অজান্তে আইনবহির্ভূতভাবে কলেজের প্যাড ব্যবহার করে নিজ স্বাক্ষরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সভাপতি পরিবর্তন করার আবেদন করেন। তাঁর প্রভাবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অনিয়ম করে গত ২৬ এপ্রিল চিঠি ইস্যু করেছে। এ চিঠিতে সারোয়ার জাহানকে সভাপতি নিয়োগ করা হয়। অথচ তাঁর বাড়ি গোদাগাড়ী পৌর এলাকায় আর কলেজ কাঁকনহাট পৌর এলাকায়। নতুন সভাপতি বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষের কথায় চলছেন।
মানববন্ধনে গভর্নিং বডির সদস্যরা জানান, নতুন সভাপতি সারোয়ার জাহান সম্প্রতি সভা ডেকে তাঁদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠি দেখে তাঁরা হতবাক হয়ে গেছেন। তাঁরা দেখেন, এই চিঠি লিখে দিয়েছেন বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সুজাউদ্দীন। চিঠির ওপরে প্রেরক ও প্রাপকের নাম-ঠিকানাও সুজাউদ্দীনের হাতে লেখা। দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষকে নিয়ে সভাপতি এটা করতে পারেন না। তাই তাঁরা সভাপতি অপসারণ ও আগের সভাপতির পুনর্বহাল দাবি করেন।
দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সুজাউদ্দীন বলেন, ‘সভাপতি নিয়োগ দিয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে আমার প্রভাবের বিষয়টি অসত্য। দুর্নীতির অভিযোগও সঠিক নয়।’ গভর্নিং বডির সভা ডেকে চিঠি লিখে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন সভাপতি কাউকে চেনেন না। আমি তাঁকে সাহায্য করেছি।’
জানতে চাইলে নতুন সভাপতি সারোয়ার জাহান প্রথমে দাবি করেন, চিঠি কে লিখে দিয়েছেন, তা তিনি মনে করতে পারছেন না। বরখাস্ত থাকা অধ্যক্ষ সুজাউদ্দীন নিজেই চিঠি লিখে দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন জানালে সভাপতি বলেন, ‘তিনি কেন এটা বললেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলে আমি বলতে পারব। তিনি তো আসলে এখন কলেজের কেউ না। আমি তাঁর সভাপতি না। আমি কলেজের সভাপতি।’