সাবেক স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই তাঁর জন্মভিটা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে। একে একে ছুটে আসতে থাকেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। অনেকেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
আজ রোববার ভোরে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯৫ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার।
দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করলেও জন্মভূমির সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর আত্মিক সম্পর্ক। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সুযোগ পেলেই তিনি গ্রামের খোঁজখবর নিতেন, এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সহযোগিতা করতেন। তাই তাঁর মৃত্যুতে নয়াবাড়ির মানুষ হারিয়েছে তাদের খুব কাছের মানুষকে।
নয়াবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার শুধু আমাদের গ্রামের নন, তিনি ছিলেন পুরো দেশের গর্ব। দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেও তিনি কখনো জন্মভূমিকে ভুলে যাননি। তাঁর মৃত্যুতে আমরা একজন অভিভাবককে হারালাম।'
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারা বলেন, জমির উদ্দিন সরকার জীবদ্দশায় বহুবার নয়াবাড়ি গ্রামের নামকে দেশজুড়ে পরিচিত করেছেন। তাঁর সততা, ব্যক্তিত্ব ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা গ্রামের মানুষের কাছে আজও অনুকরণীয় হয়ে আছে। দেশের সংসদ পরিচালনা করা ও দুবার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা এই বরেণ্য রাজনীতিকের স্মৃতি চিরকাল বেঁচে থাকবে নয়াবাড়ির মানুষের হৃদয়ে। তাঁর মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, শোকাহত পুরো জন্মভূমি।
পঞ্চগড় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জাহিরুল ইসলাম কচ্চু জানান, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ১৯৭৯ সাল থেকে তাঁর রাজনৈতিক অভিভাবক ছিলেন। পঞ্চগড়ের উন্নয়নে তাঁর অবদান অসামান্য। দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি ছিলেন পঞ্চগড়বাসীর অভিভাবক। তাঁর চলে যাওয়ায় এমন একটি শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, যা কোনো দিন পূরণ হওয়ার নয়। আজ পঞ্চগড়ের মানুষ নিজেদের অভিভাবকহীন মনে করছে।
নয়াবাড়ি গ্রামের মানুষের মধ্যে প্রিয় এই মানুষকে শেষবারের মতো জন্মভূমিতে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল। নেতা-কর্মী ও এলাকাবাসীর দাবি ছিল, জমির উদ্দিন সরকারের মরদেহ যেন অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও তেঁতুলিয়ার নয়াবাড়ি গ্রামে আনা হয়। তাঁদের বিশ্বাস, গ্রামের মাটিতে শেষবারের মতো প্রিয় নেতার মুখ দেখার সুযোগ পেলে তাঁদের শোক কিছুটা হলেও লাঘব হবে। তবে তাঁদের সে আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি।
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের বড় ছেলে ও পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নওশাদ জমির এক ভিডিও বার্তায় জানান, ফজরের সময় তাঁর বাবা ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর বাবার ইচ্ছা ও সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতীয় সংসদসংলগ্ন জাতীয় কবরস্থানে দাফন করা হবে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মরদেহ পঞ্চগড়ে আনা সম্ভব হয়নি বলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি সবার কাছে তাঁর বাবার জন্য দোয়া চান।
পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছয়টি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার ও বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। দলমত, ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি সারা জীবন মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। বিশেষ করে, পঞ্চগড়ের উন্নয়ন ও শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদান চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এদিকে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মরদেহ পঞ্চগড়ে আনা সম্ভব না হওয়ায় জেলার মানুষের উদ্যোগে গায়েবানা জানাজার আয়োজন করা হয়।
জানাজায় জেলা বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্য এবং সর্বস্তরের কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন।
জানাজা শেষে মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। এ সময় উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং দেশের একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও পঞ্চগড়ের কৃতী সন্তানকে হারানোয় শোক প্রকাশ করেন।
জেলা বিএনপির নেতারা বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার শুধু বিএনপিরই নন, পুরো পঞ্চগড়বাসীর অভিভাবক ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সততা ও জনসেবামূলক কর্মকাণ্ড মানুষের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।