টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার কৃষি খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। উপজেলার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় আউশ ধান, বীজতলা, মৌসুমি সবজি, ফল, মরিচ ও পানের বরজসহ প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পানি কমে যাওয়ার পর মরে যাচ্ছে সবজি গাছ, নুয়ে পড়ছে বীজতলার চারা। এতে প্রায় ৮০ হাজার কৃষকের ২০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতির শঙ্কা করছে কৃষি বিভাগ।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, টানা বর্ষণে বিভিন্ন ইউনিয়নে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রায় ২১ হাজার ৫২০ হেক্টর আউশ ধান, ১ হাজার ৯২০ হেক্টর আমন বীজতলা, ৯৫০ হেক্টর মৌসুমি শাকসবজি, ৫৮ হেক্টর বিভিন্ন ফলের বাগান, ৪ হেক্টর মরিচ এবং ১০ হেক্টর পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৮০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গতকাল শনিবার চরকিং চরকৈলাশ গ্রামের কৃষক কামাল উদ্দিনকে জাহাজমারা-নলচিরা প্রধান সড়কের পাশে ক্ষতিগ্রস্ত বীজতলা পরিচর্যা করতে দেখা যায়। তিনি জানান, ১০ দিন আগে ৬০ কেজি আমনের বীজ বপন করেন। টানা বর্ষণে তাঁর বীজতলা পানিতে তলিয়ে যায়। পরে বীজতলার চারপাশে উঁচু বাঁধ দিয়ে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। পানি শুকানোর সঙ্গে সঙ্গে ধানের চারা নুয়ে পড়ে। অনেকটা আশা ছেড়ে দিয়ে পুনরায় বীজ বপনের চিন্তা করছেন। এতে তাঁর ধান চাষ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শুধু কৃষক কামাল উদ্দিন নন, উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার সব এলাকায় একই অবস্থা। উপজেলার চরকিং ও চরঈশ্বর ইউনিয়ন সবজি চাষের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু ভারী বর্ষণে তলিয়ে গেছে এই দুই ইউনিয়নের অধিকাংশ সবজিখেত। এখন পানি নেমে যাওয়ার পর সবজি গাছের গোড়ায় পচন ধরে মরে যাচ্ছে। অনেকে নিজেদের সহায়-সম্বল বিক্রি করে এই সবজি চাষ শুরু করেন। আবার অনেকে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চাষে নেমেছিলেন।
চরঈশ্বর ইউনিয়নের পূর্ব গামছাখালী গ্রামটি সবজি চাষের জন্য বিখ্যাত। এখানে কৃষক ১২ মাস খেতে সবজি চাষ করে থাকেন। গত বুধবার বিকেলে কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে দেখা হয় সবজিখেতে। তাঁদের মধ্যে মোতাহের হোসেন নামের একজন জমি থেকে সবজির গাছ টেনে তুলে ফেলছিলেন।
মোতাহের হোসেন জানান, প্রায় এক একর জমিতে ঝিঙা চাষ করেছেন। এখনো বিক্রি করার মতো পরিপক্ব হয়নি। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে গাছের গোড়া পচে গেছে। এখন গাছ মরে লাল হয়ে যাচ্ছে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যে পুরো খেত একই অবস্থা হয়ে যাবে। অপেক্ষা না করে এই গাছগুলো তুলে ফেলে নতুন করে সবজি চাষের জন্য চেষ্টা করছেন।
মোতাহের আরও জানান, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে এই সবজি চাষ করেছেন। তাতে প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। সবজি বিক্রি করে এক টাকাও আয় করতে পারেননি।
হাতিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল বাছেদ সবুজ বলেন, ‘প্রতিটি ইউনিয়নে আমাদের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পরবর্তী করণীয় বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে আমরা একটি প্রতিবেদন জেলা কার্যালয়ে পাঠিয়েছি।’