শ্রীমঙ্গল উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ৩০টির বেশি পাহাড়ি ছড়া হাইল হাওরে গিয়ে মিলিত হয়েছে। এই ছড়াগুলোই এখানকার প্রাণ, প্রকৃতি ও পর্যটনের অন্যতম ধারক ও আকর্ষণ। তবে দিনের পর দিন অবৈধভাবে বালু তোলার কারবারে ছড়াগুলোর অস্তিত্ব বিপন্ন। প্রশাসনও এই বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা ও সামান্য অর্থদণ্ড দিয়েই দায় সারছে।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে কাগজে-কলমে দুটি বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো ছড়াজুড়ে (পাহাড়ি ঝর্ণা থেকে উৎপত্তি হওয়া ছোট ও অগভীর জলপ্রবাহ) আরও ২৬টি সিলিকা বালুর কোয়ারি থেকে অবৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে।
বর্মাছড়া, উদনাছড়া, হরিণছড়া, পুটিয়াছড়া, বিলাশছড়া, ফুলছড়া, কাকিয়াছড়া, আমরাইলছড়া, ইছামতিছড়া, ভুড়ভুড়িয়া, জাগছড়া, সুনাছড়া, নারাইনছড়া, বৌলাছড়া, গিলাছড়া, শিয়ালছড়া ও খাইছড়াসহ বিভিন্ন ছড়া থেকে ক্রমাগত বালু উত্তোলনের ফলে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ, প্রতিবেশ, বাড়ছে ভাঙনের ঝুঁকি। প্রশাসনের অভিযানেও থামছে না বালু তোলার হিড়িক।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সদর, সিন্দুরখান, আশিদ্রোন, সাতগাঁও, ভূনবীর, মির্জাপুর ও কালাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন ছড়া থেকে নিয়মিত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। শ্রীমঙ্গল সদর, কালিঘাট ও রাজঘাট ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানেও ছোট পরিসরে বালু তোলা হচ্ছে।
পরিবেশকর্মী তাপস দাশ বলেন, পাহাড়ি ছড়া থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে ছড়ার স্বাভাবিক প্রবাহ ও তলদেশের গঠনে পরিবর্তন আসতে পারে। এতে তীরভাঙন, কৃষিজমির ক্ষয়, সড়ক ও সেতুর ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং বসতবাড়ি ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চলতি বছরের আগস্ট থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে ১৮টি অভিযানে জরিমানা, কারাদণ্ড ও বালু জব্দ করা হলেও বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে বালু উত্তোলনকারী চক্র। স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযান শেষে অল্প কিছু টাকা জরিমানা গুনে শক্তিশালী ওই চক্রগুলো আবারও শুরু করে বালু তোলা। এতে সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারাচ্ছে। পাশাপাশি কৃষিজমি, গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও বসতবাড়ি হুমকির মুখে পড়ছে।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের আগস্ট থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত আইনে ১৮টি অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে ১ লাখ ২০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয় এবং পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জব্দ করা বালু নিলামে বিক্রি করে ২ লাখ ৭০ হাজার ২৫০ টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে।
এর আগে সিন্দুরখান, ভূনবীর, মতিগঞ্জ ও কালাপুরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ভেকু মেশিন ও অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে।
অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও পরিবহনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা ও সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটছে। সম্প্রতি একটি বালুবাহী ডায়না গাড়ির চাপায় অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত টমটমের চালকসহ ছয়জন আহত হন।
ঘটনার পর উত্তেজিত জনতা গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে শ্রীমঙ্গল-মির্জাপুর সড়ক অবরোধ করা হলে প্রায় চার ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে যান স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, এসআরবি, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা। এ ঘটনা নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সংবাদকর্মীরাও হামলার শিকার হন।
অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ঘটনায় মামলাও হয়েছে। চলতি বছরের ২ মে ভূনবীর ও মির্জাপুর এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে পরিবেশের ক্ষতি করার অভিযোগে ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
ভূনবীর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিমেল পাল বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় পাহাড়ি ছড়া ও কৃষিজমিসংলগ্ন এলাকা থেকে দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘অবৈধভাবে বালু উত্তোলন প্রতিরোধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও কৃষিজমি সুরক্ষায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কেউ আইন অমান্য করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।’
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিনহাজুল ইসলাম বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জনস্বার্থে অভিযান অব্যাহত থাকবে।