মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় এ বছর চারটি পশুর হাটের একটিরও ইজারা হয়নি। পাঁচবার দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান করেও কোনো দরপ্রস্তাব জমা পড়েনি। অথচ কোরবানির পশু বিক্রির জন্য প্রসিদ্ধ হাট চারটি গত বছর পাঁচ কোটির বেশি টাকায় ইজারা দিয়েছিল উপজেলা প্রশাসন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রভাবশালী চক্রের কারণে এবার পশুর হাটগুলো ইজারার বাইরে থেকে গেছে। এর ফলে সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব হারানোর শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও উপজেলা প্রশাসন বলছে, ইজারা না হওয়া হাটগুলো থেকে তারা নিজস্ব তত্ত্বাবধানে রাজস্ব আদায়ের (খাস কালেকশন) উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চলতি ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে এক বছরের জন্য উপজেলার ১৬টি ছোট-বড় হাট-বাজারের দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর মধ্য ১২টি হাট-বাজারের দরপ্রস্তাব পাওয়ায় উপজেলা প্রশাসন ইজারা দিতে পেরেছে। কিন্তু চারটি পশুর হাটের পাঁচ দফায় দরপত্র আহ্বান করেও কোনো ইজারাদারের সাড়া মেলেনি।
ইজারা না হওয়া হাটগুলো হলো—চান্দহর ইউনিয়নের সিরাজপুর পশুর হাট, বায়রা পশুর হাট, জয়মণ্টপ পশুর হাট এবং জামির্তা ইউনিয়নের চর রাজনগর পশুর হাট। গত বছর উপজেলার ১৬টি হাট-বাজার ৬ কোটি ২৭ লাখ ১২ হাজার ৪৩৬ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছিল। এর আগে কখনোই এসব হাট ইজারার বাইরে থাকেনি।
প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ মার্চ প্রথমবার ১৬টি হাটের দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু চারটি পশুর হাটের দরপ্রস্তাব না পাওয়ায় পর্যায়ক্রমে ৮ মার্চ, ১৫ মার্চ, ২২ মার্চ এবং সর্বশেষ ৩১ মার্চ পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়।
জানা গেছে, গত বছর সিরাজপুর পশু ও সাধারণ হাট ২ কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়। হাটটির সরকারি সর্বনিম্ন দর ছিল ১ কোটি ৪৯ লাখ ৮৫ হাজার ৯১৪ টাকা। এ বছর ৩০ হাজার ৬০০ টাকা মূল্যের চারটি শিডিউল বিক্রি হলেও কেউ দরপ্রস্তাব জমা দেননি। বায়রা পশুর হাট গত বছর ১ কোটি ৩০ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়। হাটটির প্রাক্কলিত দর ছিল ৭৭ লাখ ১১ হাজার টাকা। এবার ১৬ হাজার ২০০ টাকা মূল্যের ছয়টি দরপত্র বিক্রি হয়। কিন্তু একটিও জমা পড়েনি।
প্রতিযোগিতাপূর্ণ হিসেবে পরিচিত জয়মণ্টপ পশুর হাট গত বছর ১ কোটি ৯০ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়। এ হাটের সরকারি সর্বনিম্ন দর ধরা হয়েছিল ৪৬ লাখ ৩৮ হাজার ৬৬৬ টাকা। এ বছর ছয়জন দরপত্র সংগ্রহ করলেও কেউ তা দাখিল করেননি। এ ছাড়া জামির্তা ইউনিয়নের চর রাজনগর পশুর হাটও গত বছর সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে ইজারা দেওয়া হয়েছিল। হাটটির সরকারি সর্বনিম্ন দর ছিল ৩২ লাখ ৪৯ হাজার ৫৬০ টাকা। এবার চারজন দরপত্র সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত কোনো প্রস্তাব জমা পড়েনি।
স্থানীয় বাসিন্দা তারিকুর রহমান আলাল বলেন, সিংগাইর উপজেলার বিএনপির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ও স্থানীয় প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তাঁদের কারণেই এবার পশুর হাটগুলোর ইজারা হয়নি। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ইজারাদার বলেন, একসঙ্গে বড় পশুর হাটগুলোর দরপত্র বিক্রি হওয়ার পরও দরপ্রস্তাব জমা না পড়ার ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। পাঁচ দফায় দরপত্র আহ্বান করেও সাড়া না পাওয়া অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে।
মানিকগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সহকারী সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) ও পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর একদল ভাইফোঁটা নেতা তৈরি হয়েছে; যাদের দৃশ্যমান কোনো আয় নেই। তারা দলের নাম ভাঙিয়ে দেশের অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি করেছে। তারা দল, দেশ ও জাতির শত্রু। এসব নেতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে জনমত গড়ে তুলতে হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খায়রুন্নাহার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা পঞ্চমবার পর্যন্ত দরপত্র আহ্বান করেছি। দরপত্র সংগ্রহ করা হলেও কেউ তা জমা দেননি। তাই নিয়ম অনুযায়ী খাস কালেকশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সিন্ডিকেটের অভিযোগ সম্পর্কে আমার জানা নেই।’