কুড়িগ্রামে গবাদিপশুর মধ্যে খুরারোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে অন্তত ৯টি গরু এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কুড়িগ্রাম সদর, রাজারহাট এবং ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় ২৫০ থেকে ৩০০ গরু খুরারোগে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। কোরবানির ঈদের আগে খুরারোগ ছড়িয়ে পড়ায় খামারি ও গবাদিপশুর মালিকদের দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, কোরবানি ঈদ সামনে রেখে কুড়িগ্রামে এ বছর ১ লাখ ১৬ হাজার গরু এবং ১ লাখ ৮০ হাজার ছাগল-ভেড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম সদরের কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের জোৎগোবরধন গ্রামের গৃহস্থ আলতাফ হোসেন বলেন, ‘আমার ফ্রিজিয়ান জাতের একটি গাভি খুরারোগে আক্রান্ত হয়ে গত সপ্তাহে মারা গেছে। গাভিটি গর্ভবতী ছিল। চিকিৎসা করেও কোনো লাভ হয় নাই। আমার অন্তত দেড় লাখ টাকা লোকসান হলো। গ্রামে আরও গরু খুরারোগে আক্রান্ত হয়েছে।’
এই ইউনিয়নের হরিশ্বর গ্রামের বাসিন্দা কৃষক আবু হোসেন বলেন, ‘প্রতিবছর ঈদে বিক্রির জন্য দু-একটা গরু পালন করি। এবার যখন গরু বিক্রির সময় হলো তখনই খুরারোগ আমার সব শেষ করে দিল। গরুটা খুব অসুস্থ। বিক্রি তো করতে পারব না, বাঁচবে কি না তা-ও জানি না।’
একই সমস্যায় ভুগছেন ওই গ্রামের আরেক ক্ষুদ্র খামারি একরামুল হক। তাঁর খামারে তিনটি গরু খুরারোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে দুগ্ধবতী একটি গাভির জিহ্বা খুরারোগে আক্রান্ত হয়ে খসে গেছে। দুশ্চিন্তায় অন্ধকার দেখছেন একরামুল। তিনি বলেন, ‘খামারের গরুর দুধ বিক্রি করে আমার আয় হয়। এখন সেই আয় বন্ধ। চিকিৎসা করাচ্ছি। কিন্তু গরু-বাছুর বাঁচবে কি না, সেটাই বুঝতে পারছি না।’
সদরের বেলগাছা ইউনিয়নের পল্লিচিকিৎসক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘অনেক গরু খুরারোগে আক্রান্ত হচ্ছে। চিকিৎসায় সুস্থও হচ্ছে। তবে ঈদের আগে এই রোগের সংক্রমণ খামারি ও গৃহস্থদের লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে রোগাক্রান্ত গরু বিক্রি করতে পারবে না। অপরদিকে সুস্থ হওয়া গরুর স্বাস্থ্যহানি হওয়ায় দাম কম পাবে।’
রোগ ছড়ানোর কারণ উল্লেখ করে এই পল্লিচিকিৎসক বলেন, ‘রোগ প্রতিরোধে সরকারিভাবে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিনেশন হয়নি। আবার বাজারে ভ্যাকসিনের দাম বেশি হওয়ায় রোগাক্রান্ত হওয়ার আগে গরুর মালিকেরা ভ্যাকসিন কিনতে চান না। ফলে রোগ ছড়িয়ে পড়ে। তবে এবার চিকিৎসায় আক্রান্ত গরু সুস্থ হওয়ার হার বেশি।’
উলিপুরের চরাঞ্চলেও গবাদিপশুর মধ্যে খুরারোগের ব্যাপক সংক্রমণ দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের পল্লিচিকিৎসক সফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘মোল্লারহাট এলাকাসহ ব্রহ্মপুত্র চরাঞ্চলে ব্যাপক হারে খুরারোগ দেখা দিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার অন্তত ৩০টি আক্রান্ত গরু দেখেছি। বিশেষ করে ঈদ উপলক্ষে মোটাতাজা করা গরুগুলো আক্রান্ত হওয়ায় পালনকারীরা অনেক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।’
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, খুরারোগ ভাইরাসবাহিত। দ্রুত এক গরু হতে আরেক গরুতে ছড়িয়ে পড়ে। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘তিনটি উপজেলায় সংক্রমণের মাত্রা বেশি হলেও অন্য উপজেলাতেও রোগ দেখা যাচ্ছে। এ পর্যন্ত শুধু গরুর মধ্যে এই রোগ ছড়িয়েছে। আমরা মাঠপর্যায়ে থেকে আক্রান্ত পশুর চিকিৎসা দিচ্ছি।’
চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায় প্রশ্নে মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘রোগ প্রতিরোধে রিং ভ্যাকসিনেশন অর্থাৎ আক্রান্ত এলাকার চারপাশে সব গবাদিপশুকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে হয়। এই রোগের ভ্যাকসিন কিছুটা ব্যয়বহুল। সরকারিভাবে ভ্যাকসিন সরবরাহ থাকলেও পরিমাণ কম। আবার বাজারে দাম একটু বেশি। রোগাক্রান্ত পশুকে অন্য পশু থেকে আলাদা করে চিকিৎসা দিতে হবে। সর্বোপরি গবাদিপশু পালনকারীদের সচেতনতা বাড়াতে হবে।’