কুড়িগ্রাম-রংপুর মহাসড়কের ছিনাই বাজার থেকে একটি সড়ক নেমে গেছে সবুজে ঘেরা সিংহীমারী গ্রামের দিকে। মেঠো পথ পেরিয়ে গ্রামের ভেতরে ঢুকতেই ভেসে আসে শিশুদের কণ্ঠে লালনের গান—‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি...।’ গানের সুর অনুসরণ করে এগিয়ে গেলে দেখা মেলে অন্য রকম এক আয়োজনের। একটি বাড়ির উঠানে অর্ধশতাধিক শিশু বসে আছে লোকবাদ্যযন্ত্র নিয়ে। কারও হাতে দোতারা, কেউ বাজাচ্ছে একতারা, কেউবা বাঁশি ও তবলা। চলছে গান ও বাদ্যযন্ত্রের অনুশীলন।
এটি কোনো আনুষ্ঠানিক সংগীতানুষ্ঠান নয়, হারিয়ে যেতে বসা লোকসংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার এক নিরন্তর প্রয়াস। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের বৈদ্যেরবাজার সিংহীমারী গ্রামে গড়ে উঠেছে লোকসংস্কৃতির এমনই এক পাঠশালা—‘সেবালয় গুরুগৃহ’। শিশু-কিশোরদের বিনা মূল্যে লোকগান ও লোকবাদ্যযন্ত্র শেখানোর এ উদ্যোগের পেছনে রয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘মায়ের তরী’। এক দশক ধরে প্রতি শুক্র ও শনিবার এখানে চলে সংস্কৃতিচর্চা।
সাধারণ বাড়িই হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক পাঠশালা
সেবালয় গুরুগৃহে নেই আধুনিক সংগীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো সাজানো শ্রেণিকক্ষ কিংবা পর্যাপ্ত সরঞ্জাম। গ্রামের একটি সাধারণ বাড়ির উঠানেই বসে গানের আসর। সেখানে স্থানীয় সংস্কৃতিসেবীরা শিশুদের গান ও বাদ্যযন্ত্র শেখান। শিশুরা মনোযোগ দিয়ে সুর তোলে, ভুল করে, আবার গুরুর নির্দেশনায় নতুন করে অনুশীলন করে।
‘মায়ের তরী’র লোকবাদ্যযন্ত্রের প্রশিক্ষক ও প্রধান গুরু নারায়ণ চন্দ্র রায় জানান, শুধু সেবালয় নয়, কুড়িগ্রামে চারটি ও লালমনিরহাটে পাঁচটিসহ মোট নয়টি গুরুগৃহ পরিচালনা করছে সংগঠনটি। প্রতিটি গুরুগৃহে বিনা মূল্যে লোকসংগীত ও লোকবাদ্যযন্ত্র শেখানো হয়। স্থানীয় সংস্কৃতিসেবী ও প্রশিক্ষকদের স্বেচ্ছাশ্রমে চলছে এসব কার্যক্রম।
প্রধান গুরুর মতে, লোকবাদ্যযন্ত্র কেবল বিনোদনের উপকরণ নয়; এগুলো একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের অংশ। শিশুদের হাতে এসব বাদ্যযন্ত্র তুলে দিতে পারলে হারিয়ে যেতে বসা সুর ও বাদন রীতি নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে। তাই গানের পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা ও চর্চার শৃঙ্খলা গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
যেভাবে শুরু ‘মায়ের তরী’
ভিনদেশি এক নারীর বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির প্রতি মুগ্ধতা থেকেই ‘মায়ের তরী’র যাত্রা শুরু। সংগঠনটির অন্যতম সংগঠক সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী ইউসুফ আলমগীর জানান, নরওয়ের কবি, লেখক, লোকগবেষক ও আলোকচিত্রী উয়েরা সেথে ১৯৯৮ সালে কুড়িগ্রামের রৌমারীতে আসেন। স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন, বিশেষ করে নারীদের কণ্ঠে মরমি গান তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। তিনি উপলব্ধি করেন, এসব গানের মধ্যে বিনোদনের পাশাপাশি রয়েছে জীবনদর্শন, প্রেম, বিরহ, আধ্যাত্মিকতা ও মানবিকতার শিক্ষা।
পরবর্তী সময়ে উয়েরা সেথে লালনের ৫৩টি গান নরওয়েজীয় ভাষায় অনুবাদ করেন। বাংলাদেশের মানুষের জীবন, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের আগ্রহ এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের উদ্যোগে ২০১৬ সালে গড়ে ওঠে ‘মায়ের তরী’। বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করতেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে।
শিশুদের হাতেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার
‘মায়ের তরী’র সবচেয়ে বড় শক্তি এর শিশু শিক্ষার্থীরা। প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ পরিবারের এসব শিশু এখানে বিনা মূল্যে গান ও বাদ্যযন্ত্র শেখার সুযোগ পাচ্ছে। অর্থনৈতিক সামর্থ্য সীমিত হলেও সাংস্কৃতিক চর্চার আগ্রহে তারা নিয়মিত গুরুগৃহে আসে।
সেবালয়ের শিক্ষার্থী সাথী রায় বলেন, ‘আমি দশ বছর ধরে এখানে শিখছি। গানের পাশাপাশি বাদ্যযন্ত্র বাজানোও শিখছি। গ্রামের ছোট ছোট শিশুরাও আমাদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে নিজেদের সংস্কৃতি চর্চা করছে। গুরুরা নিজেদের সময় ও শ্রম দিয়ে বিনা মূল্যে আমাদের শেখাচ্ছেন। আমরা শিখে অন্যদেরও শেখাতে চাই।’
অভিভাবকেরাও মনে করেন, পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ শিশুদের আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে সহায়তা করছে।
স্থানীয় অভিভাবক আদুরি রায় বলেন, ‘আমার মেয়ে ও ছেলে এই সেবালয়ে গান ও বাদ্যযন্ত্র শেখে। আমারও শেখার খুব ইচ্ছা ছিল, কিন্তু সুযোগ হয়নি। আমাদের মতো প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুরা এমন সুযোগ পাচ্ছে, এটা গর্বের বিষয়। তারা নিজেদের সংস্কৃতি লালন করতে শিখছে।’
গুরুরা শেখান স্বেচ্ছাশ্রমে
সেবালয়ের কার্যক্রমের মূল ভিত্তি স্থানীয় গুরুদের আন্তরিকতা ও স্বেচ্ছাশ্রম। গুরু নিমাই চন্দ্র ও নির্মল চন্দ্র মনে করেন, লোকসংগীত শেখানোর মধ্য দিয়ে শিশুদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া সম্ভব। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের লোকসংস্কৃতির ধারক ও বাহক। তাই ছোটবেলা থেকেই তাদের হাতে ঐতিহ্যের দায়িত্ব তুলে দিতে হবে।
তবে এই উদ্যোগ চালিয়ে যেতে নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হচ্ছে সংগঠকদের। বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ ও মেরামত, প্রশিক্ষকদের সম্মানী, যাতায়াত এবং গুরুগৃহগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে প্রয়োজন নিয়মিত অর্থায়ন। কিন্তু স্থায়ী অর্থের সংস্থান না থাকায় অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
‘মায়ের তরী’র অন্যতম সংগঠক ইউসুফ আলমগীর মনে করেন, লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণের দায়িত্ব শুধু শিল্পী বা সাংস্কৃতিক সংগঠনের নয়; রাষ্ট্র ও সমাজেরও। তাঁর ভাষায়, লোকসংস্কৃতিকে শুধু উৎসব কিংবা বিশেষ দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে শিশুদের নিয়মিত শিক্ষার অংশ করতে হবে। নদীভাঙনে ঘর হারানো মানুষও গানের মধ্যে নিজের শিকড় খুঁজে পান। সেই শিকড় নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছে ‘মায়ের তরী’।
সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক সুজন কুমার বেদ বলেন, নয়টি গুরুগৃহকে সমন্বিত সাংস্কৃতিক শিক্ষাব্যবস্থার আওতায় আনতে পারলে কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন স্থায়ী প্রশিক্ষণকেন্দ্র, বাদ্যযন্ত্র, প্রশিক্ষকদের সম্মানী ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা। কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও এ উদ্যোগ ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন তাঁরা।
স্বপ্ন আনন্দ আশ্রম, ডিজিটাল আর্কাইভ ও লোকসংগীত ইনস্টিটিউটের
‘মায়ের তরী’র ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও বেশ বিস্তৃত। সংগঠক ইউসুফ আলমগীর জানান, প্রবীণ লোকশিল্পী, বাউল, ভাওয়াইয়া শিল্পী ও লোকবাদ্যযন্ত্রীদের জন্য একটি ‘আনন্দ আশ্রম’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন রয়েছে তাঁদের। জীবনের শেষ পর্যায়ে অবহেলা ও আর্থিক অনিশ্চয়তায় থাকা শিল্পীরা সেখানে আশ্রয়, সম্মান ও সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি নিজেদের অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারবেন।
এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলের হারিয়ে যেতে বসা লোকগান, শিল্পীদের কণ্ঠ, বাদ্যযন্ত্রের সুর, গীতিকার ও সুরকারদের পরিচিতি এবং গানের ইতিহাস সংরক্ষণে একটি ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য একটি পূর্ণাঙ্গ লোকসংগীত ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, যেখানে নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও শিল্পী তৈরির কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
প্রয়োজন সম্মিলিত সহযোগিতা
এসব স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং দেশ-বিদেশের সংস্কৃতিপ্রেমীদের সহযোগিতা চান সংগঠকেরা। তাঁদের মতে, গুরুগৃহগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশিক্ষকদের সম্মানী, বাদ্যযন্ত্র সরবরাহ ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে উদ্যোগটি আরও শক্তিশালী হবে।
সিংহীমারী গ্রাম থেকে ফেরার সময় কানে ভেসে আসে শিশুদের কণ্ঠে লালনের গান। সাধারণ একটি বাড়ির উঠানে দোতারা, একতারা আর বাঁশির সুরে মিশে যায় একঝাঁক শিশুর কণ্ঠ। দৃশ্যটি যেন মনে করিয়ে দেয়, সংস্কৃতি শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক জীবন্ত উত্তরাধিকার। সেই উত্তরাধিকার বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্ন নিয়েই এগিয়ে চলেছে ‘মায়ের তরী’।