কিশোরগঞ্জের গ্রামগঞ্জে শিশুদের শরীরে ফুটে ওঠা লালচে ফুসকুড়ি এখন আর কেবল সাধারণ চর্মরোগ নয়; বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলায় হঠাৎ করেই ছোঁয়াচে রোগ হামের প্রকোপ বেড়েছে। বছরের প্রথম তিন মাসেই আড়াই শতাধিক শিশু আক্রান্ত হওয়ার তথ্য মিলেছে, যা ভাবিয়ে তুলেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগকে। আক্রান্ত এক শিশুর মৃত্যু এবং জেলায় আইসিইউ সংকটের খবর অভিভাবকদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে ২৪৮ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে। বর্তমানে জেলায় চিকিৎসাধীন ৭৭ জন। সন্দেহভাজন ৭৭ শিশুর নমুনা পরীক্ষা করে ১৮ জনের শরীরে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এর মধ্যে জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। মৃত শিশু আমির হামজার (৪ মাস) বাড়ি কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বৌলাই ইউনিয়নে। সে কিশোরগঞ্জের কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়নি। গত ২৪ মার্চ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির পর ৩ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
হাসপাতালগুলোতে হামের রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড খোলা হলেও দুশ্চিন্তা কাটছে না স্বজনদের। কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডের বাইরে অপেক্ষমাণ করিম মিয়া বলেন, ‘ছেলের সারা শরীরে ফুসকুড়ি আর প্রচণ্ড জ্বর। এখানে ভর্তি করেছি ঠিকই; কিন্তু শুনছি অবস্থা খারাপ হলে ঢাকা বা ময়মনসিংহে নেওয়া লাগবে। আমাদের মতো গরিব মানুষের পক্ষে তো দৌড়াদৌড়ি করা সম্ভব না। জেলা শহরেই কেন সব সুবিধা থাকবে না?’
শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি এক শিশুর মা ফারজানা জানান, প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে করলেও তিন দিন পর শরীরে দানা উঠতে শুরু করে এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। বর্তমানে হাসপাতালে স্যালাইন ও ওষুধ দেওয়া হলেও আইসিইউ লাগবে কি না, সে ভয়ে আছেন তিনি।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ২৬, শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৫ এবং ১২ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫টি করে মোট ১০১টি আইসোলেশন বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে জেলায় বিশেষায়িত আইসিইউ সুবিধা না থাকায় গুরুতর রোগীদের ময়মনসিংহ বা ঢাকায় স্থানান্তর করতে হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন অভিজিৎ শর্মা জানান, জেলায় হামের টিকার কোনো ঘাটতি নেই। সংকট মোকাবিলায় আগামী ২০ এপ্রিল থেকে জেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে। তিনি বলেন, ‘যারা আগে টিকা নিয়েছে, তারাও এবার টিকা নিতে পারবে। এতে কোনো ঝুঁকি নেই; বরং সুরক্ষা বাড়বে।’
শিশুর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা জ্বরের লক্ষণ দেখা দিলে ঘরে বসিয়ে না রেখে দ্রুত কাছের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।