হাওরবেষ্টিত কিশোরগঞ্জ জেলায় ৫ লাখ ২১ হাজার ৬০০টি কৃষক পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ১৯৬টিই ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক পরিবার; যা শতাংশের হিসাবে ৯০ ছুঁই ছুঁই। এসব পরিবারের কৃষকের কোনো আবাদি জমি না থাকায় ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদের কৃষিঋণ নিতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে তাঁদের চড়া সুদে মালিকদের কাছ থেকে জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করতে হচ্ছে। ফলে তাঁরা সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও আশানুরূপ লাভের মুখ দেখতে পারছেন না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কিশোরগঞ্জ কার্যালয় সূত্রে কৃষকদের এই পরিসংখ্যান জানা গেছে। তাঁদের দেওয়া তথ্যমতে, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় হাওরে ফসল ফলানোর কাজে জড়িত ৮৯ শতাংশই ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের। নিজের চাষের জমি না থাকায় তাঁরা ব্যাংকের কৃষিঋণের আওতার বাইরে রয়েছেন। ফলে কৃষকদের ফসল উৎপাদন, মৎস্য, পোলট্রি ও ডেইরি খাতের জন্য সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে কৃষিঋণ দেওয়া হলেও হাওরের কৃষকেরা তা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।
সম্প্রতি জেলার বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে কৃষকেরা পুরোদমে বোরো চাষে ব্যস্ত। চারা রোপণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। চারদিকে শোনা যায় পানি তোলার জন্য ব্যবহৃত শ্যালো মেশিনের শব্দ। সদ্য রোপা জমিতে দেওয়া হচ্ছে সেচ। সার প্রয়োগ ও পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষক।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাওরের ভূমিহীন বোরো চাষিরা স্থানীয়ভাবে ‘জমা’ পদ্ধতিতে জমি লিজ নিয়ে আবাদ করেন। অর্থাৎ তাঁদের জমি বাবদ এবং সার, বীজ ও সেচের জন্য শুরুতেই নগদ টাকার প্রয়োজন হয়। এ জন্য কৃষকেরা মহাজন বা বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়া সুদে টাকা নিয়ে এ প্রয়োজন মেটান। ফসল ওঠার পর সেই সুদ ও আসল পরিশোধ করতে হয়।
করিমগঞ্জের চংনোয়াগাঁওয়ের ভূমিহীন কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘ব্যাংক আমাদের বলে, জমির কাগজ দেখাতে। আমরা তো জমির মালিক নই। তাই বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছ থেকে টাকা নিতে হয়।’
মিঠামইন উপজেলার গোপদীঘির আলাল মিয়া বলেন, ‘ফসল ওঠার পর আগে সুদের টাকা শোধ করতে হয়। এতে খুবই সীমিত লাভ থাকে।’
রফিক মিয়া নামের আরেকজন বলেন, ‘কখনো ফসলের মৌসুমে বন্যা হলে সব শেষ হয়ে যায়। ফসল শেষ হয়ে গেলেও ঋণ আর সুদ থেকে যায়।’
অন্যদিকে জমির মালিকেরা বলছেন, শ্রমিক সংকট, উচ্চ মজুরি এবং অন্য পেশায় যুক্ত হয়ে পড়ার কারণে তাঁরা নিজেরা আর চাষাবাদ করেন না। তাই টাকার বিনিময়ে তাঁদের জমিজমা দিয়ে দেন ভূমিহীন কৃষকদের।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের করিমগঞ্জ উপজেলার মরিচখালী বাজার শাখার কর্মকর্তা সাগর আহমেদ বলেন, ‘বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী জমির মালিক যদি ভূমিহীন কৃষকের জামিনদার হন, তবেই কৃষিঋণ দেওয়া সম্ভব।’
জানা গেছে, জেলায় ৩৩টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কৃষিঋণ বিতরণ করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষিঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৫৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে ৭৩ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৬০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে ২৬৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
অগ্রণী ব্যাংকের কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপককে (এজিএম) ও জেলা কৃষিঋণ বিতরণ কমিটির সদস্যসচিব মোবারক হোসেন বলেন, ‘যাঁদের জমির কাগজপত্র আছে, তাঁরা খুব সহজেই কৃষিঋণ পান। আর যাঁদের জমির কাগজ নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে জমির মালিককে জামিনদার হতে হয়।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কিশোরগঞ্জের উপপরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান বলেন, ‘এ বছর জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হচ্ছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১ লাখ ৯৫ হাজার ২৯ টন ধান। যাঁরা সরাসরি
মাঠে নেমে চাষ করেন, তাঁদের সহজশর্তে কৃষিঋণ দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি কৃষকদের শস্যবিমার আওতায় আনা দরকার।’