ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়পুরহাটের দুই আসনের ফলাফলে স্পষ্ট হয়েছে—জেলায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। অন্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেননি; ভোটের বড় অংশই গেছে এই দুই দলের ঝুলিতে।
জয়পুরহাট-১ (সদর ও পাঁচবিবি) আসনে জামায়াত প্রার্থী ফজলুর রহমান সাঈদ পেয়েছেন ১ লাখ ৬৫ হাজার ১৯২ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মাসুদ রানা প্রধান পেয়েছেন ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩০৯ ভোট। ব্যবধান ৯ হাজার ৮৮৩টি। এতে আসনটিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে।
মোট প্রদত্ত ভোটের প্রায় পুরোটাই দুই প্রার্থীর মধ্যে ভাগ হওয়ায় বোঝা যায়, ভোটারদের আস্থা কেন্দ্রীভূত ছিল প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তির ওপর। স্বতন্ত্র ও বাম ঘরানার প্রার্থীরা এক হাজার ভোটের ঘরও স্পর্শ করতে পারেননি; ফলে রাজনৈতিক মাঠে তাঁদের উপস্থিতি ছিল সীমিত।
অন্যদিকে জয়পুরহাট-২ (আক্কেলপুর, ক্ষেতলাল ও কালাই) আসনের চিত্র ভিন্ন। এখানে বিএনপির আব্দুল বারী ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৫ ভোট পেয়ে জয় পান। জামায়াতের এস এম রাশেদুল আলম পেয়েছেন ৯২ হাজার ৫১৭ ভোট। ব্যবধান ৬৫ হাজারের বেশি—যা তুলনামূলকভাবে একতরফা ফলের ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনে বিএনপির দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভিত্তি, স্থানীয় প্রভাব ও প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জামায়াত উল্লেখযোগ্য ভোট পেলেও ব্যবধান কমানোর মতো সমীকরণ তৈরি করতে পারেনি।
দুই আসনেই স্বতন্ত্র ও ছোট দলগুলোর ভরাডুবি হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী জামানত রক্ষায় মোট প্রদত্ত ভোটের ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রয়োজন হলেও অধিকাংশ ছোট প্রার্থী সে সীমার কাছাকাছিও যেতে পারেননি। এতে জয়পুরহাটে ভোটের মেরুকরণ যে দ্বিমুখী, তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে সংগঠন, কেন্দ্রভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও ভোটার সমাবেশ—এই তিন উপাদানই ফল নির্ধারণে মুখ্য হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়পুরহাটের দুই আসনের ফলাফলে যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা কেবল সংখ্যার হিসাব নয়—এটি রাজনৈতিক শক্তির মানচিত্র। একদিকে বিএনপি-জামায়াতের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অন্যদিকে ছোট দলগুলোর প্রান্তিক অবস্থান—এই সমীকরণ আগামী দিনে স্থানীয় রাজনীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করতে পারে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, যদি বড় কোনো জোটগত পরিবর্তন বা নতুন নেতৃত্বের উত্থান না ঘটে, তবে জয়পুরহাটের রাজনীতি আপাতত এই দুই শক্তিকে ঘিরেই আবর্তিত হবে। ভোটারদের আচরণও ইঙ্গিত দিচ্ছে—তাঁরা বিভক্ত হলেও সিদ্ধান্তে স্পষ্ট; পছন্দ সীমিত দুই মেরুতেই।