যশোরে বোরো আবাদ
যশোর সদর উপজেলার ধোপাখোলা গ্রামের কৃষক মোস্তফা। চলতি বোরো মৌসুমে ধান চাষ করেছেন পাঁচ বিঘা জমিতে। মাসখানেক আগে রোপণ করা এসব চারা লালচে হয়ে যায়। জমিতে সার না দিলে থোড় আসবে না। তাই গত মঙ্গলবার সকালে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে জমিতে ইউরিয়া, টিএসপি, দস্তাসহ তিন ধরনের সার ছিটাচ্ছিলেন।
ডিলাররা সারের বাড়তি মূল্য আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিনে কৃষকের সঙ্গে কথা বলতে গেলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মোস্তফা। একদিকে খেতের চারা নিয়ে দুশ্চিন্তা, অন্যদিকে বাড়তি দামে সার কেনায় ক্ষুব্ধ তিনি।
মোস্তফা বলেন, ‘প্রতি বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ৪৬০ টাকায় কিনতে হয়। ডিএপির দাম পড়ে ১ হাজার ২৫০ টাকা। সার, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি দিয়ে এখন আর বোরো আবাদ করে খুব একটা লাভের মুখ দেখা যায় না। এ জন্য অনেকেই বোরো আবাদের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। আবার অনেকে চাষ করছেনই না। সেচ, সার, ওষুধের যে ব্যয়, তা দিয়ে এখন পুষিয়ে থাকা দুষ্কর।’
পাশের জমিতে আগাছা পরিষ্কার করছিলেন চান্নু মিয়া। খেত থেকে তিনি উঠে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে তাঁর নানা অভিযোগ ও ক্ষোভের কথা তুলে ধরেন। চান্নু মিয়া বলেন, ‘১ হাজার ৫০ টাকার ডিএপি সার ১ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১ হাজার ২৫০ টাকার ইউরিয়া সার কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৪৫০ টাকায়। ভরা মৌসুমে সার লাগবেই। তাই বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দামেই সার কিনতে হচ্ছে।’
জানা গেছে, বোরো মৌসুমে সরকার-নির্ধারিত দামে সার পাচ্ছেন না যশোরের কৃষকেরা। এতে বোরো আবাদে ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। সঙ্গে সেচ, কীটনাশক ও সেচের খরচ মিটিয়ে লাভের সম্ভাবনা দেখছেন না কৃষকেরা। ফলে অনেকে বোরো আবাদের পরিধি কমিয়েছেন।
কৃষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বোরো মৌসুমে জমিতে প্রচুর ইউরিয়া ও ডিএপি সারের প্রয়োজন হয়। কৃষকদের এসব সার সংগ্রহ করতে হয় সারের ডিলার, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে। বেশি জমি আবাদ করেন এমন কয়েকজন কৃষক জানান, ডিলারদের কাছ তাঁরা প্রতি ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া কিনছেন ১ হাজার ৪৫০ টাকায়। আর একই ওজনের প্রতি বস্তা ডিএপি সার কিনতে হয় ১ হাজার ২৫০ টাকায়। এতে প্রতি কেজি সারের দাম পড়ে ২৯ টাকা। প্রতি কেজি ডিএপি সারের দাম পড়ে ২৫ টাকা; কিন্তু সরকার ইউরিয়া সারের প্রতি কেজির মূল্য নির্ধারণ করেছে ২৭ টাকা এবং ডিএপি সারের মূল্য প্রতি কেজি ২১ টাকা। সাব ডিলার অথবা স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কিনলে সারের দাম পড়ে আরও বেশি।
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা সার মজুত করে কেজিতে ২-৩ টাকা বেশি দামে বিক্রি করে। আবার বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ডিলাররা বরাদ্দ করা সার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে শুধু পছন্দের কিছু খুচরা বিক্রেতার কাছে এবং যাদের সাব-ডিলারের লাইসেন্স নেই, তাঁদের কাছেও অধিক মুনাফায় বিক্রি করছেন।
মনিরামপুর উপজেলার রোহিতার কৃষক নাজমুল বলেন, ‘মৌসুমের সময় অধিক দামে সার কিনতে হয়। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিকল্পিত সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে। সরকারি ডিলারদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সার পাওয়া যাচ্ছে না, অথচ গ্রামের খুচরা দোকানে বেশি দামে মিলছে সেই সার।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সাব-ডিলার সারের অতিরিক্ত মূল্য নেওয়ার অভিযোগ স্বীকার করেন। তাঁরা বলেন, ‘বিসিআইসি ডিলারদের কাছ থেকে ডিএপি সার আমাদের বেশি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তাঁরা আমাদের কোনো রসিদ দেন না। যেহেতু এসব ডিলার রাজনীতিক ছত্রচ্ছায়ায় নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হয়, তাই তাঁদের কথার বাইরে যেতে পারি না।
মনিরামপুরের রোহিতা ইউনিয়নের সারের ডিলার ইসমাইল পাটোয়ারি বলেন, সরকার সারের যে কমিশন দেয়, তা দিয়ে পরিবহন খরচ ও ক্ষতিগ্রস্ত (ড্যামেজ) সারের ব্যয় ওঠে না। ফলে অনেক সময় লোকসান গুনতে হয়।
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘সরকার কৃষকদের জন্য ভর্তুকি মূল্যে সার দিচ্ছে। সার ক্রয়-বিক্রয়ে কোনো কারসাজি বা সিন্ডিকেট করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’