গাজীপুরের শ্রীপুরে জলাবদ্ধতা আর উচ্ছেদের আশঙ্কায় দিন কাটছে রবিদাস সম্প্রদায়ের ১৮টি পরিবারের। তাদের অভিযোগ, একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করে পানি যাওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই ঘরে পানি ঢুকছে। সাপ-জোঁকের উপদ্রবও বেড়েছে। বসতভিটা ছাড়তে বাধ্য করতেই এমনটি করা হচ্ছে বলে দাবি তাদের। তবে অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ী ইউনিয়নের মালিপাড়া গ্রামে প্রায় শত বছর ধরে রবিদাস সম্প্রদায়ের ১৮টি পরিবার বসবাস করছে। কয়েক বছর আগে তাদের বসতির পাশের কৃষিজমিতে ফয়েজ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোন নামের একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এর পর থেকে শুরু হয় সমস্যা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে উঁচু সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করেছে। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ঘরবাড়ি, উঠান ও টয়লেট পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যায়। দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় গাছপালা নষ্ট হচ্ছে, বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এরই মধ্যে কয়েকটি পরিবার বাধ্য হয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।
রবিদাস সম্প্রদায়ের সদস্যদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে তাঁদের বসবাসের পরিবেশ অনুপযোগী করে তোলা হচ্ছে। উদ্দেশ্য হলো, তাঁরা যেন বাধ্য হয়ে নিজেদের বসতভিটার জমি বিক্রি করে এলাকা ছেড়ে চলে যান।
রবিদাস সম্প্রদায়ের বাসিন্দা বাসন্তী রানী রবিদাস বলেন, দিনের বেলা কোনোভাবে সময় কাটলেও রাত হলে তাঁদের আতঙ্ক বেড়ে যায়। তাঁর অভিযোগ, কারখানার মালিকের পক্ষে বাবুল নামের এক ব্যক্তি একাধিকবার এসে জমি বিক্রির জন্য চাপ দিয়েছেন। জমি না ছাড়লে নির্যাতন আরও বাড়বে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা রবিদাস সম্প্রদায়ের মানুষ। তাই আমাদের অভিযোগ কেউ গুরুত্ব দেয় না।’
বাসন্তী রানী আরও বলেন, রাতে একদিকে বুলডোজার দিয়ে উচ্ছেদের ভয়, অন্যদিকে জলাবদ্ধতার কারণে সাপ-জোঁকের আতঙ্কে ঘুমাতে পারেন না তাঁরা। শিশুদের শরীরেও জোঁক লেগে যায়। ফলে ১৮টি পরিবারে সদস্যরা প্রতিদিনই চরম অনিশ্চয়তা ও ভয়ে রাত কাটাচ্ছেন।
আরেক বাসিন্দা হীরালাল রবিদাস বলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষ প্রায় শত বছর আগে এখানে বসতি গড়েছিলেন। বর্তমানে সেখানে ১৮টি পরিবারের প্রায় ১৫০ জন সদস্য বসবাস করছেন। জলাবদ্ধতার কারণে এরই মধ্যে চারটি বসতঘর পরিত্যক্ত হয়েছে। ঘরে পানি ঢুকে পড়ায় কয়েকটি পরিবার বাধ্য হয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, ‘আমরা জুতা সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করি। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লড়াই করার সামর্থ্য আমাদের নেই। কয়েক বছর ধরে গ্রামের মাতব্বর, থানা-পুলিশ ও ইউএনও কার্যালয়ে ঘুরেছি, কিন্তু প্রতিকার পাইনি। এখন নির্যাতনের মাত্রাও বেড়েছে। মনে হচ্ছে, শত বছরের বসতভিটা ছেড়ে চলে যেতে হবে। আমাদের কথা কেউ শোনে না; কারণ, আমরা রবিদাস সম্প্রদায়ের মানুষ।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফয়েজ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোনের প্রতিষ্ঠাতা দেলোয়ার হোসেন ফারুক বলেন, ‘আমার নিজের জায়গায় সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করছি। এতে যদি কোনো সমস্যা হয়, সে জন্য আমার কিছু করার নেই।’ তবে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে পরিবারগুলোকে উচ্ছেদের চেষ্টা এবং জমি বিক্রির জন্য হুমকি-ধমকির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদ ভূঞা বলেন, ‘একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’