গাইবান্ধা সদর সাবরেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের দলিল লেখকেরা অভিযোগ করেছেন, চাঁদাবাজি, হুমকি ও মবের শিকার হচ্ছেন তাঁরা। আজ মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুরে গাইবান্ধা সদর সাবরেজিস্ট্রারের অফিস প্রাঙ্গণে অনির্দিষ্টকালের জন্য কলমবিরতি ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা।
বিক্ষোভ কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, একদল বহিরাগত অফিসে এসে দলিল লেখকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা দাবি করছে। এই চাঁদাবাজদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় না আনা পর্যন্ত দলিল লেখকদের কলমবিরতি কর্মসূচি চলবে।
এর আগে গত রোববার চাঁদাবাজির অভিযোগে স্থানীয় আব্দুর রউফসহ ১০-১২ জনের নামে গাইবান্ধা সদর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো মোস্তাফিজুর রহমান মল্লিক।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, আব্দুর রউফসহ ১০-১২ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে দলিল লেখকদের কাছে চাঁদা দাবি করেছে। গত শনিবার (৯ মে) সন্ধ্যায় গাইবান্ধা পুরোনো জেলখানার মোড়ে মোস্তাফিজুর রহমানের পথ আটকে প্রতি দলিল বা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দেয় চক্রটি। টাকা দিতে রাজি না হলে মোস্তাফিজুরকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এ ছাড়া দলিল লেখকদের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করার হুমকি দেওয়া হয়। পরদিন রোববার (১০ মে) দুপুরে গাইবান্ধা সদর সাবরেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা মানববন্ধনের নামে জড়ো হয়ে দলিল লেখক ও অভিযোগকারীকে লক্ষ্য করে গালিগালাজ এবং মব সৃষ্টি করেন। এতে কার্যালয়ে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দলিল লেখকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এদিন রাতে সদর থানায় মোস্তাফিজুর রহমান থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, কার্যালয়ের গেট খুলে দিলে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দলবদ্ধ হয়ে অফিসের মূল ফটকে লাথি মারেন, হত্যার হুমকি দেন এবং মোস্তাফিজুর রহমানকে টানাহেঁচড়া করে লাঞ্ছিত করেন। পরে উপস্থিত দলিল লেখক ও সংবাদকর্মীদের সহায়তায় তিনি রক্ষা পান। খবর পেয়ে গাইবান্ধা সদর থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পালিয়ে যান।
আজ মঙ্গলবার অফিসের সামনে অবস্থান নিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সম্পদ বিনষ্ট ও হত্যার হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেন দলিল লেখক সমিতির সদস্যরা। পরে দুপুরে চাঁদাবাজির প্রতিবাদে কলমবিরতি ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন দলিল লেখকেরা।
বিক্ষোভে বক্তব্য দেন দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মল্লিক, দলিল লেখক জাহাঙ্গীর আলম মন্ডল, আজিম উদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম মিথেনসহ অন্যরা।
দলিল লেখক সমিতির সদস্য জাহাঙ্গীর আলম মন্ডল বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে দলিল লিখে আসছি। সম্প্রতি একটি কুচক্রী মহল চাঁদার দাবিতে আমাদের কাছে আসে। তারা প্রত্যেকেই শহরের চিহ্নিত মাদকসেবী। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।’
দলিল লেখক সমিতির সদস্য সিরাজুল ইসলাম মিথেন বলেন, ‘আমরা কষ্ট করে আয় করি। আমাদের পরিশ্রমের টাকা কোনো চাঁদাবাজকে দিতে চাই না। আজ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কলমবিরতি করেছে সদর উপজেলা দলিল লেখক সমিতি।’
সদর দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মল্লিক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘শহরের কিছু চিহ্নিত চাঁদাবাজ বেশ কিছুদিন ধরে দলিলপ্রতি ৫০০ টাকা করে চাঁদা দাবি করে আসছে। গরিব দলিল লেখকদের কষ্টে উপার্জিত টাকা আমরা কেন চাঁদাবাজদের দেব।’
মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, এই ঘটনায় চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সদর থানায় অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার করা না হলে কলমবিরতি অব্যাহত থাকবে। অন্যথায় দেশব্যাপী বৃহত্তর পরিসরে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
জানতে চাইলে অভিযুক্ত আব্দুর রউফ বলেন, ‘২০০৯ সাল থেকে গাইবান্ধা জেলা সাবরেজিস্ট্রি অফিসে দলিল লেখক সমিতির তথাকথিত সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর মল্লিকের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জিম্মি করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। জাল স্ট্যাম্প ব্যবহার, পে-অর্ডারের জালিয়াতি এবং সমিতির নামে সরকারি নিয়মের তোয়াক্কা না করে অতিরিক্ত চাঁদা আদায়ের পাহাড়সম অভিযোগ রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে। বর্তমানে কোনো বৈধ কমিটি না থাকলেও প্রতি দলিলে ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা করে অবৈধভাবে আদায় করা হচ্ছে, যার মাসিক পরিমাণ প্রায় ৫০ লাখ টাকা। এই নজিরবিহীন দুর্নীতির প্রতিবাদ জানানোর কারণে আমাকে অপরাধী বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’
গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) শরীফ আল রাজিব বলেন, ‘এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’