গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের একটি গ্রামে অসুস্থ গরু জবাই, মাংস কাটাকাটি ও বণ্টনের পর অনেকের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৩৭ জন নারী-পুরুষ ও শিশু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছে। এদিকে, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে তারাপুর, কঞ্চিবাড়ি, সোনারায় এবং রামজীবন ইউনিয়নেও অ্যানথ্রাক্স রোগী পাওয়া গেছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, ‘চিকিৎসা নেওয়া ৩৭ জনের মধ্যে নারী ১৯ জন, শিশু ৪ জন এবং ১৪ জন পুরুষ। তাদের সবার শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ পাওয়া গেছে এবং সবাইকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস এবং হাসপাতাল সূত্র জানায়, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের একটি গ্রামে অসুস্থ গরু জবাই করে মাংস খাওয়ার পর ছয়জন অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা নেয়। এরপর ৯ সেপ্টেম্বর উপজেলার সবার্নন্দ ইউনিয়নের বাছহাটি গ্রামের মঞ্জুরুল ইসলাম নামের একজনের গাভি অসুস্থ হয়ে পড়লে জবাই করে মাংস ভাগ করে নেয় গ্রামের ১০০টি পরিবার। ১৮ সেপ্টেম্বর প্রথমে সাতজনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দেয়। পরে উপজেলার আরও চারটি ইউনিয়নে উপসর্গ ছড়িয়ে পড়ে। বাকি ইউনিয়নগুলো হলো তারাপুর, কঞ্চিবাড়ি, সোনারায় ও রামজীবন।
অ্যানথ্রাক্স রোগের লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন বাছহাটি গ্রামের রুমি বেগম (২৯)। তিনি বলেন, ‘অসুস্থ গুরুর মাংস রান্না করে আমরা খেয়েছি। দু-এক দিন পরে আমার বাঁ হাতে ফোসকা পড়ে। ফোসকা বড় হলে তীব্র জ্বরে ভুগি। এরপর গ্রামে আরও অনেক মানুষের একই অবস্থা হয়। তারপর হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিই।’ বাছহাটি গ্রামের শফিক আলম বলেন, ‘আমি মাংস খাইনি। মঞ্জুরুল ইসলামের অসুস্থ গরুটি জবাই করেছিলাম শুধু। আমার দুই হাতে রক্ত লেগেছিল। এর কয়েক দিন পরে আমার দুই হাতে দুইটা ফোসকা ওঠে। আট দিন হলো চিকিৎসা নিচ্ছি।’
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস বাছহাটি গ্রামের অসুস্থ গরুর মাংসের দুটি নমুনা সংগ্রহ করে ২১ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় অনুসন্ধান গবেষণাগারে পাঠায়। গত বুধবার পাওয়া সেই রিপোর্টে দুটি নমুনায় অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কে এম ইফতেখারুল ইসলাম।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. কামরুল হাসান বলেন, ‘রোগীদের মধ্যে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ রয়েছে এবং আক্রান্ত গরুর মাংসে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু পাওয়া গেছে; তাই ধরে নেওয়া যায় তাঁরা অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত। এর আগে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে কঞ্চিবাড়ি গ্রামে যে ছয়জনের মধ্যে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দিয়েছিল, তাদের নমুনা পরীক্ষা করে আমরা চারজনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু পেয়েছি।’
ঢাকা থেকে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ছয়জন গবেষক এবং আইসিডিডিআরবির দুজন গবেষক গতকাল সকালে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসেছেন। কামরুল হাসান জানান, এই আটজন গবেষক কয়েক দিন ধরে নমুনা সংগ্রহ করবেন, রোগের উৎস সম্পর্কে জানার চেষ্টা করবেন এবং জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করবেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘অ্যানথ্রাক্স দমনের প্রধান উপায় মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরি করা এবং এই কাজে মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়ানো। এ ছাড়া আক্রান্ত এলাকায় কোনো অসুস্থ পশু জবাই করার আগে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের ভেটেরিনারি সার্জনের কাছ থেকে ছাড়পত্র নেওয়া।’
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ইফতেখারুল ইসলাম জানান, গত বছর সুন্দরগঞ্জে একটি গ্রামে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ হয়েছিল, সেই কারণে এ বছর জুলাই থেকে ১৫টি ইউনিয়নে রিং ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রমের আওতায় গত বছর থেকে এখন পর্যন্ত ১৯ হাজার গুরুকে অ্যানথ্রাক্সের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে।
ইফতেখারুল ইসলাম আরও জানান, নিয়ম অনুযায়ী আক্রান্ত এলাকার তিন কিলোমিটারের মধ্যে ১০০ ভাগ গবাদিপশুকে ভ্যাকসিন দেওয়ার কার্যক্রম চালু রয়েছে। বর্তমানে ১১ হাজার ভ্যাকসিন মজুত আছে। এ ছাড়া ১৫ হাজার ভ্যাকসিন বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত আক্রান্ত এলাকায় ভ্যাকসিন কার্যক্রম শেষ করা যাবে।