রানা প্লাজার ছয়তলার ‘ইথার টেক্স’ কারখানায় কাজ করতেন বরিশালের শিলা বেগম (৩২)। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ভবন ধসের দিন ভারী বিমের নিচে চাপা পড়ে তিনি গুরুতর আহত হন। দুর্ঘটনায় তাঁর নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে আসে, মেরুদণ্ডে মারাত্মক আঘাত লাগে এবং ডান হাত ভেঙে যায়।
ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রায় ১৮ ঘণ্টা আটকে থাকার পর অচেতন অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করা হয়। প্রথমে সাভারের একটি বেসরকারি হাসপাতাল, পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং এরপর পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে (সিআরপি) নেওয়া হয়। টানা পাঁচ বছরের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পর তিনি দাঁড়াতে সক্ষম হলেও এখনো অন্যের সহায়তা ছাড়া হাঁটতে পারেন না। কোমরের বেল্ট ও হাতের ব্রেসই তাঁর নিত্যসঙ্গী।
দুর্ঘটনার পর সরকারি সহায়তা হিসেবে তিনি পান মাত্র ৩৪ হাজার টাকা। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে আরও প্রায় ৭০ হাজার টাকা সহায়তা মেলে। এরপর আর কোনো নিয়মিত সহায়তা পাননি শিলা বেগম। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে কাজ হারিয়ে এখন অন্যের সহায়তায় জীবন কাটছে তাঁর। স্বামীর মৃত্যুর পর জীবিকার তাগিদে সাভারে এসে নতুন করে শুরু করা জীবন রানা প্লাজা ধসে থমকে যায়। বর্তমানে তিনি সাভার পৌর এলাকার থানা রোডের একটি ভাড়া কক্ষে থাকেন।
এদিকে প্রতিবছরের ২৪ এপ্রিলের মতো এবারও রানা প্লাজার সামনে জড়ো হন আহত শ্রমিক ও নিহতদের স্বজনেরা। অস্থায়ী বেদিতে ফুল দিয়ে তাঁরা শ্রদ্ধা জানান। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন দিনটি নানা কর্মসূচির মাধ্যমে স্মরণ করে।
রানা প্লাজা সারভাইভারস অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত আলোচনা সভায় সাভারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী রানা প্লাজার জমি বর্তমানে ঢাকার জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। ওই জমিতে একটি মার্কেটসহ বহুতল ভবন নির্মাণ করে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের বিষয়টি সরকারের বিশেষ বিবেচনায় রয়েছে এবং দ্রুত বাস্তবায়নের আশা করা হচ্ছে।’
গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, ‘রানা প্লাজা ধস ছিল বিশ্বের অন্যতম নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড। ঘটনার পর নানা আশ্বাস দেওয়া হলেও ১৩ বছর পর এসে দেখা যাচ্ছে, সেই প্রতিশ্রুতির বেশির ভাগই বাস্তবায়িত হয়নি।’
তাঁর অভিযোগ, সরকার ও মালিকপক্ষ ধীরে ধীরে শ্রমিকদের কথা ভুলে গেছে, আর শ্রমিকদের জীবনমানেও উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার শ্রমিক ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, এই ঘটনায় ১ হাজার ১৩৮ জনের বেশি শ্রমিক নিহত এবং আড়াই হাজারের বেশি আহত হন। একইভাবে ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডেও ১১৪ জন শ্রমিক প্রাণ হারান।
তিনি বলেন, এ ধরনের বড় দুর্ঘটনার পরও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক এখনো ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন থেকে বঞ্চিত। অধিকাংশ মামলার অগ্রগতি নেই, যা বিচারহীনতার দৃষ্টান্ত।
তিনি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্মূল্যায়ন, ক্ষতিপূরণ প্রদান, পুনর্বাসন ও বিশেষ চিকিৎসা নিশ্চিত করা, ‘এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম’ চালু, বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত বিচার এবং অনুদানের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশের দাবি জানান। পাশাপাশি দায়ী মালিকদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয়, স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং ২৪ এপ্রিলকে ‘শ্রমিক হত্যা দিবস’ ঘোষণার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, রানা প্লাজা ধস কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তিনি দ্রুত বিচার শেষ করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান। পাশাপাশি নিহতদের পরিবার ও আহতদের আজীবনের আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলেন।
তিনি আরও দাবি জানান, শ্রমিক ছাঁটাই, হামলা ও মিথ্যা মামলা বন্ধ করতে হবে, শ্রমিকদের নিয়োগপত্র নিশ্চিত করতে হবে এবং গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রণয়ন করে শ্রম আদালতে ১৫০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে সব শিল্পকারখানায় ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভার প্রধান তাসলিমা আখতার বলেন, ১৩ বছর পেরিয়েও রানা প্লাজার ক্ষত এখনো শুকায়নি। শিলা বেগমদের মতো হাজারো শ্রমিক আজও সেই দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন এবং ন্যায্যবিচার না পাওয়ার বেদনা নিয়ে অপেক্ষা করছেন।