তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি থেকে অর্থ পুনর্নির্দেশ করে বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি বছরে ১ দশমিক ৫ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি সাশ্রয় করতে পারে। অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য জ্বালানি সংকট কমানোয় সৌরবিদ্যুতের কোনো বিকল্প নেই।
আজ সোমবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তাদের থেকে এসব কথা উঠে আসে।
২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সরকারি লক্ষ্যমাত্রাকে স্বাগত জানিয়ে ‘নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা ও পথনকশা উপস্থাপন’ শীর্ষক এই আলোচনা সভা আয়োজন করে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ, জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (জেট-নেট বিডি) ও বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)।
প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশ জ্বালানি সংকটের একটি জটিল সময় পার করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দেশের আমদানিনির্ভরতা যথাক্রমে ৬৫ শতাংশ এবং ৬২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, ডিজেল ও কয়লার দাম বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। এতে ইস্টার্ন রিফাইনারির কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে পড়ে এবং দেশে লোডশেডিং ২ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। এ ছাড়া জ্বালানি ভর্তুকির চাপও বাড়ছে। এলএনজি আমদানিতে প্রতি ঘনমিটারে ৬৫ টাকা বেশি এবং ডিজেলে লিটারপ্রতি ৭০ টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে।
বক্তারা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান এক হাজার কোটি টাকার রিফাইন্যান্স স্কিম বাড়িয়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ রিভলভিং ফান্ড গঠনের সুপারিশ করা হয়। রুফটপ সোলার, ব্যাটারি স্টোরেজ ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর বিদ্যমান উচ্চ শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানান তাঁরা। কৃষি খাতে সোলার সেচ জনপ্রিয় করতে এক হাজার কোটি টাকার অনুদান তহবিল গঠনের কথাও তুলে ধরা হয়।
বাস্তবায়ন কৌশল হিসেবে এনজিও ও বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে ক্লাস্টারভিত্তিক ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তোলা, দেশের গ্রামগুলোকে বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎকেন্দ্রে রূপান্তর ও স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। পাশাপাশি সরকারি জমিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়।
ব্রিফিংয়ে আরও বলা হয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিক থেকে বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করবে। রুফটপ সোলার ব্যবহারে ফার্নেস অয়েলের বিকল্প তৈরি করে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। সেচপাম্পের এক-তৃতীয়াংশ সোলারে রূপান্তর করলে বছরে ২০ থেকে ৩০ কোটি ডলার সাশ্রয় হতে পারে। একইভাবে পরিবহন খাতের ৩০ শতাংশ ডিজেলচালিত যান বৈদ্যুতিক করলে বছরে প্রায় ৭০ কোটি ডলার সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তরই বাংলাদেশকে জ্বালানি সার্বভৌমত্বের পথে এগিয়ে নিতে পারে।
মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন জেট-নেট বিডির উপদেষ্টা কমিটির সদস্য শফিকুল আলম ও জাকির হোসেন খান। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বাদাবন সংঘের নির্বাহী পরিচালক লিপি রহমান, ব্রাইট গ্রিন এনার্জি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান দীপাল চন্দ্র বড়ুয়া, উলাশী সৃজনী সংঘের নির্বাহী পরিচালক খন্দকার আজিজুল হক মনি, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশনের ব্যবস্থাপক মো. আবুল কালাম আজাদ।