তৈরি পোশাক খাতে নারীদের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার অন্যতম কারণ সন্তান লালন–পালন। নিরাপদ ডে-কেয়ার ও শিশুযত্ন সুবিধার অভাবে অনেক নারীশ্রমিক চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এতে যেমন দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি নারীদের কর্মক্ষমতাও অব্যবহৃত থেকে যায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের শ্রমিক ও তাদের শিশুদের অধিকার এবং কল্যাণ নিশ্চিত বিষয়ক জাতীয় সংলাপে বক্তারা এ সব কথা বলেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এডুকো বাংলাদেশ ও সবুজের অভিযান ফাউন্ডেশন যৌথ উদ্যোগে এই সংলাপ আয়োজন করে।
সংলাপে জাতীয় শ্রমিক জোট বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক নাঈমুল আহসান জুয়েল বলেন, আমাদের নারীরা কাজ শিখছে, অভিজ্ঞতা অর্জন করছে। খুব কম বয়সে তাদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। এরপর যখন তারা মা হচ্ছে, বাচ্চাকে কই রাখবো, সেই চিন্তা থেকে অনেকে চাকরি ছেড়ে দিচ্ছে। এতে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং নারীরা কর্মক্ষেত্র থেকে সরে যাচ্ছেন।
সংলাপে মূল উপস্থাপনা তুলে ধরেন এইচ-অ্যান্ড-এইচ রিসার্চ অ্যান্ড কনসালটেন্সির প্রধান নির্বাহী ইরফাত আরা ইভা। তিনি বলেন, গার্মেন্টস খাতে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক স্বাস্থ্যকে আলাদা কোনো বিষয় হিসেবে দেখা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এটি উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
তার ভাষায়, ‘ডে-কেয়ার, শিশু শিক্ষা এবং মানসিক সহায়তা কার্যক্রম চালুর পর আমরা দেখেছি শ্রমিকদের উদ্বেগ অনেক কমে গেছে। বিশেষ করে নারী শ্রমিকরা এখন কাজের সময় মানসিকভাবে অনেক বেশি স্থিতিশীল থাকছেন, যার প্রভাব পড়ছে তাদের কাজের গুণগত মানে।’
তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের মানসিক চাপ কমানো মানে শুধু মানবিক সুবিধা নয়, এটি সরাসরি শিল্পের দক্ষতা বৃদ্ধির একটি কৌশল।
সংলাপে এডুকো বাংলাদেশ তাদের পরিচালিত’ স্মাইল’ প্রকল্প থেকে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে। সেখানে বলা হয়, ঢাকা ও গাজীপুরের ১৯টি তৈরি পোশাক কারখানায়’ স্মাইল’ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় ডে-কেয়ার সেন্টার (দিবা যত্ন কেন্দ্র) ও কমিউনিটি বেইজড লার্নিং সেন্টার (শিশু শিক্ষা কেন্দ্র) স্থাপন করা হয়েছে। আয়োজকদের দাবি, এসব উদ্যোগ শ্রমিক সন্তুষ্টি বৃদ্ধি, অধিকার বিষয়ে সচেতনতা, মানসিক চাপ হ্রাস এবং শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রমে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
এডুকো বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদুল হামিদ বলেন, শ্রমিক ও তাদের সন্তানের কল্যাণে বিনিয়োগকে এখন আর আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘ডে-কেয়ার বা শিশু শিক্ষাকেন্দ্র কেবল সহায়তা কর্মসূচি নয়, এটি একটি টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার ভিত্তি। শ্রমিক যদি মানসিকভাবে স্বস্তিতে না থাকে, তাহলে উৎপাদনশীলতা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব নয়। তাই এই বিনিয়োগকে সামাজিক দায়িত্ব নয়, উন্নয়ন কৌশল হিসেবে দেখতে হবে।’
সংলাপে প্রধান অতিথি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, শ্রমিকদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এককভাবে সরকার, শিল্পমালিক বা উন্নয়ন সংস্থার পক্ষে এই পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সংলাপে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের বাণিজ্য সংগঠন বিকেএমইএর পরিচালক ইমরান কাদের, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যুগ্ম মহাপরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ভূঁইয়া প্রমুখ।
সমাপনী বক্তব্যে সবুজের অভিযান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মাহমুদা বেগম বলেন, শ্রমিক ও তাদের সন্তানের কল্যাণকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে না দেখে জাতীয় উন্নয়ন কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। শ্রমিকবান্ধব পরিবেশ তৈরি না হলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।