ঢাকায় হানি ট্র্যাপে ফেলে এক পাঠাও চালকের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় ও নির্যাতনের হত্যার অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। হত্যার পর লাশ গুম করতে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে তুরাগ নদে ফেলে দেওয়া হয়। পরে চালকের ব্যবহৃত প্রাইভেট কারটি নিয়ে পালিয়ে যান চক্রের সদস্যরা।
আজ শনিবার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জানিয়েছে, নিহত ব্যক্তি মো. লোকমান সরদার (৩৮)। তিনি ‘পাঠাও’ ও ‘ইনড্রাইভ’-এর মাধ্যমে ভাড়ায় গাড়ি চালাতেন। এই ঘটনায় কথিত হানি ট্র্যাপ চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে নিহত ব্যক্তির লুট হওয়া প্রাইভেট কারটি।
গ্রেপ্তার চারজন হলেন মো. এস এম সালমান, মো. আদিব ইসলাম, জান্নাতুল ফেরদৌস মীম ওরফে আনিবা জারা ও মো. সবুজ মিয়া।
ঢাকার উত্তরা, তুরাগ, দক্ষিণখান, গাজীপুরের টঙ্গী ও গাছা এবং কক্সবাজারে অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সেই সঙ্গে গাজীপুরের গাছা এলাকা থেকে নিহত ব্যক্তির লুট হওয়া প্রাইভেট কারটি উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তাঁরা।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে সালমান আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই। এ ছাড়াও হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্য পলাতক সদস্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানানো হয়।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, গত ৩০ মে বিকেলে কুড়িলের বাসা থেকে ভাড়ায় গাড়ি চালানোর উদ্দেশ্যে বের হন লোকমান। এরপর তিনি আর বাসায় ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরা তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় তুরাগ নদে বস্তাবন্দী একটি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। স্বজনেরা খবর পেয়ে মরদেহটি লোকমানের বলে শনাক্ত করেন।
পিবিআই ঢাকা মেট্রোপলিটন উত্তরের তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, চক্রের সদস্য জান্নাতুল ফেরদৌস মীম ওরফে আনিবা জারা কৌশলে লোকমানকে টঙ্গীর পাখির বাজার এলাকায় ডেকে নেন। সেখানে আগে থেকেই ওত পেতে ছিলেন সালমান, আদিব ইসলাম, সবুজ মিয়াসহ কয়েকজন। তাঁরা লোকমানকে আটকে মারধর করে এবং মাদক সেবনের অভিযোগ তুলে তাঁর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা আদায় করেন।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মুক্তিপণ আদায়ের পরও লোকমানকে ছেড়ে দেওয়া হয়নি; বরং তাঁকে বেধড়ক মারধর করা হয়। এতে তাঁর হাত-পাসহ শরীরের অন্যান্য অঙ্গ ভেঙে যায়। একপর্যায়ে তাঁকে হাত-পা বেঁধে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে তুরাগ নদে ফেলে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁর ব্যবহৃত প্রাইভেট কারটি ছিনিয়ে নিয়ে যান চক্রের সদস্যরা।
পিবিআইয়ের ভাষ্য, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে কথিত স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন বা বন্ধু পরিচয়ে বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে ‘হানি ট্র্যাপ’ পরিচালনা করত। তরুণ, শিক্ষার্থী, চালকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে টার্গেট করে তারা বাসায় ডেকে নিত। এরপর মাদক সেবন বা অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকাপয়সা ও মূল্যবান জিনিস হাতিয়ে নিত।
পিবিআই ঢাকা মেট্রোর (উত্তর) এসআই জাকারিয়া আলম বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য ছিল হানি ট্র্যাপের মাধ্যমে অর্থ আদায় ও সর্বস্ব লুট করা। তবে নির্যাতনের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে একপর্যায়ে ভুক্তভোগীর মৃত্যু হয়। পরে ঘটনাটি গোপন করতে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।’