ধারালো অস্ত্রের আঘাতে কেউ হাত হারিয়েছেন, কেউ পা। কেউ আবার পঙ্গু হয়ে গেছেন। কাটা অঙ্গের বীভৎস ছবি ও ভিডিও আবার টিকটকে শেয়ার করা হয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে তাঁদের এমন অবস্থা হয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভুক্তভোগী ও হামলাকারী সবাই মূলত গ্যাংয়ের সদস্য। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে মাঝেমধ্যেই অস্ত্রবাজি করেন তাঁরা। এ নিয়ে থানায় মামলাও হয়েছে। তবে পুলিশ দু-তিনজন ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
এই গ্যাংয়ের তৎপরতা রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার নবীনগর এলাকায়। গ্যাংয়ের ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলে এবং সিসিটিভি ফুটেজ দেখে জানা গেছে এসব ভয়ংকর তথ্য।
এর মধ্যে নবীনগর হাউজিং এলাকার ৩ নম্বর রোডের বাসিন্দা আরমান হোসেন (২৮)। পেশায় গাড়িচালক বলে পরিচয় দেন তিনি। গত ২৫ আগস্ট রাত সোয়া ৮টার দিকে নবোদয় হাউজিং বি-ব্লকের ১ নম্বর রোডে ওয়াসা পানির পাম্পের পাশে সাত-আটজনের একটি দল চাপাতি ও ছুরি নিয়ে তাঁর ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা আরমানের বাঁহাতের কবজি পর্যন্ত কেটে নিয়ে যায়। ডান হাত ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরমানের সঙ্গে গত ২৭ আগস্ট কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ‘২৬ আগস্ট গ্রামের বাড়িতে অসুস্থ স্ত্রীকে দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। খরচের জন্য ২০ হাজার টাকা পকেটে ছিল। এই টাকা ছিনিয়ে নিতেই আমাকে কুপিয়েছে। টাকা নিতে বাধা দেওয়ায় আমার হাত কেটে নিয়ে গেছে।’
হামলায় কারা জড়িত ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাত থেকে আটজনের একটি দল হঠাৎ হামলা করেছে। তাদের মধ্যে রাফাত, তুষার ও ইউনুসকে চিনতে পেরেছি।’ হামলাকারীদের সঙ্গে তাঁর কোনো বিরোধ ছিল না বলে দাবি করেন আরমান।
তবে আজকের পত্রিকার অনুসন্ধানে জানা গেছে, ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে নয়, পূর্ববিরোধ ও মাদক কারবারের টাকার ভাগাভাগি নিয়ে এ ঘটনা ঘটেছে। আরমানও এলাকায় একটি মাদকের স্পট নিয়ন্ত্রণ করতেন।
ছেলের ওপর হামলার খবরে শরীয়তপুর থেকে ঢাকায় ছুটে এসেছেন আরমানের মা রেহানা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার তিন ছেলের মধ্যে বড় ছেলেটি প্রতিবন্ধী। আরমানের আয়ে সংসার চলত। এখন প্রতিদিন চিকিৎসা ও রক্তের খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছি।’
তবে ১ সেপ্টেম্বর দুপুরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চিকিৎসাধীন আরমান গত ২৭ আগস্টই মোহাম্মদপুর থানায় বাদী হয়ে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও অজ্ঞাতনামা দু-তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলা নম্বর ১৫২। মামলায় আরমানের স্বাক্ষর না থাকলেও একটি টিপসই রয়েছে।
মামলায় আসামিরা হলেন ইউনুস, তুষার, রাফাত, শাকিল, নুর আলম ওরফে নুরা, আহম্মেদ ও শাহাদাৎ ব্যাপারী। তাঁদের মধ্যে শাকিল, নুর আলম ওরফে নুরা ও শাহাদাৎ ব্যাপারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে আনোয়ারকেও গ্রেপ্তারের তথ্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়লেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে তিনি আত্মগোপনে।
মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ১ সেপ্টেম্বর বেলা ৩টার দিকে আরমানের মা রেহেনা বেগম মোবাইল ফোনে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা কোনো মামলা করিনি। আমার ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালেই আছি। সাংবাদিক, র্যাব, পুলিশ এসেছিল, তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু এখন আমরা শুনছি, পুলিশ নাকি মামলা করেছে। আমরা মামলার বিষয় কিছু জানি না।’
মামলায় চিকিৎসাধীন আরমানের টিপসই থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পুলিশ এক দিন রাত ৩টার দিকে এসে একটা কাগজে আরমানের ডান হাতের টিপসই নিয়ে যায়। কিন্তু কাগজে কী লেখা ছিল সেটা আমরা জানি না। পরে শুনেছি, সেটাই মামলার কাগজ ছিল। কিন্তু মামলা চালানোর মতো অবস্থা আমার নেই।’
এই ঘটনায় সেন্টুর ভাই জাহাজীর মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেছেন। আসামিরা হলেন আনোয়ার ওরফে শ্যুটার আনোয়ার (৩২), রাফাত (২৮), তুষার (২৬), নাছির ওরফে পাগলা নাসির (২৬), বাবু ওরফে টুন্ডা বাবু (২৮), নাঈম ওরফে ভাগ্নে নাঈম (২৭), রবিউল ওরফে হাতিয়ার রবিউল (২৯)।
মামলায় বাবু ওরফে টুন্ডা বাবু, নাসির ওরফে পাগলা নাসির গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে সেটিও হয়েছে বাদীর চেষ্টায়। হামলার কিছুদিন পরে ছিনতাই মামলায় গ্রেপ্তার হন এই আসামি। পরে বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।
অভিযোগে বাদী উল্লেখ করেছেন, একসময় সেন্টু আসামিদের সঙ্গে মাদকের কারবার করতেন। পরে কারবার ছেড়ে দিতে চাইলে তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করা হয়।
একই গ্যাং আদাবর ৭ নম্বর এলাকার বাসিন্দা রাকিব আলমগীরের ওপর গত ২৯ জুলাই হামলা চালায়। ঘটনার দিন নবোদয় হাউজিং এলাকা দিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর গতিরোধ করেন তাঁরা। এরপর অন্য একটি রাস্তায় নিয়ে গিয়ে মাথা, হাত, পিঠসহ শরীরে বিভিন্ন স্থানে কুপিয়ে গুরুত্বর আহত করে ফেলে যান।
এ ঘটনায় চিকিৎসা গ্রহণ শেষে রাকিব বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। মামলায় আসামি আনোয়ার ওরফে শ্যুটার আনোয়ার (৩২), তুষার (২৬), আহমেদ (২৩), ইউনুসসহ (২৭) আরও চার-পাঁচজন। মামলায় বাবু ওরফে পেপার বাবু ও শাকিল নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে বাকিরা।
হামলার বিষয়ে রাকিব বলেন, ‘ঘটনার কয়েক মাস আগে বাসার সামনে থেকে অস্ত্রের মুখে আসামিরা আমার মোবাইল ফোন ছিনতাই করে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় আদাবর থানায় জিডি করি। এরপরই তারা আমাকে কুপিয়ে সুজুকি জিক্সার মডেলের মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এই মোটরসাইকেল দিয়ে আমি পাঠাও চালাতাম। মোটরসাইকেলটা ওরা এখনো ব্যবহার করছে। কিন্তু পুলিশ কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করেনি। মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বারবার হুমকি দিচ্ছে। বাইক ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়েও দিচ্ছে না। আয় বন্ধ থাকায় বাবা-মা-ভাই-বোন ও স্ত্রীকে নিয়ে বিপাকে পড়েছি।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোহাম্মদপুরের নবীনগর, ঢাকা উদ্যান, নবোদয় হাউজিং ও আদাবর থানার শেখেরটেক এলাকায় দাপিয়ে বেড়ানো এই গ্যাংটির হাতে গত তিন মাসে হামলার শিকার হয়েছেন অন্তত আটজন। এর মধ্যে পাঁচজন পঙ্গু হয়ে গেছেন। এই পাঁচজনের মধ্যে দুজনের হাত কেটে নিয়ে গেছে তারা। একজনের হাতের রগ কেটে দেওয়া হয়েছে। একজনের পায়ের রগ ও অপর একজনের হাতের আঙুল কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
গ্যাংটির ধারালো অস্ত্রের হামলায় পঙ্গু হওয়া ব্যক্তিরা হলেন মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যানের আলমঙ্গীর মণ্ডল ওরফে পষু, শাকিল ওরফে সেন্টু, নবীনগর হাউজিংয়ের মনির ও আরমান হোসেন ও আদাবর ৭ নম্বর এলাকার লিটন।
এসব ঘটনায় আহত তিনজনের মাধ্যে আদাবর এলাকার জনি ও লিটনের নাম জানা গেছে। গ্যাংটির হাতে আহত হয়েছে এক স্কুলছাত্রও। তবে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এই আটটি ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে তিনটি।
গত ৩ জুন রাতে গ্যাংয়ের হামলায় বাঁহাতের কবজি পর্যন্ত হারান আলমঙ্গীর মণ্ডল ওরফে পষু। তিনি থানায় মামলা করেননি। পষুর ঠিকানায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে তিনি কারাগারে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, হামলাকারীদের সঙ্গে ছিনতাই করলেও পষু গোপনে পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন। আনোয়ারের গ্যাংয়ের সদস্যদের ধরিয়ে দেওয়ায় তারা তাঁর বাঁহাত কেটে নিয়েছে। সেই বিচ্ছিন্ন হাত নিয়ে টিকটকে ভিডিও বানিয়েছে তারা। সেই ভিডিও এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও গোচরে আছে সেই ঘটনা।
মোহাম্মদপুরে একটি গ্যাংয়ের হাতে তিন মাসে পাঁচজন পঙ্গু হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) এইচ এম আজিমুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ঘটনাগুলো আমাদের নজরে আছে। প্রতিটি ঘটনার পরে মামলা ও জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। সর্বশেষ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। আমরা কাজ করছি। সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এসব ঘটনা জানে র্যাবও। মাত্র তিন মাসের মধ্যে পাঁচজনকে কুপিয়ে পঙ্গু করার বিষয়টি জানা থাকলেও অভিযোগ না পাওয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন র্যাব-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি আনোয়ার হোসাইন। হাত কেটে নিয়ে টিকটক ভিডিও তৈরি করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো পক্ষই মামলা করেনি। যত দূর শুনেছি তারা সবাই পলাতক।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখে জুনের হামলাকারীরা পলাতক। অথচ জুনের পরও চক্রটি চারজনকে কুপিয়ে পঙ্গু করেছে।