অনেকের পরিকল্পনায় ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা সংঘটিত হয়েছে বলে দাবি করেছে এ মামলার বাদীপক্ষ। তারা বলেছে, এ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীদের এখনো শনাক্ত করা হয়নি। এ জন্য আরও তদন্ত প্রয়োজন। এ ছাড়া একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের পরিকল্পনায় হাদিকে হত্যা করা হয়েছে, মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এমন তদন্ত প্রতিবেদন রীতিমতো হাস্যকর বলেও মন্তব্য করেছে তারা।
হাদি হত্যা মামলায় ডিবির দাখিল করা অভিযোগপত্র (চার্জশিট) প্রত্যাখ্যান করে আজ বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) দুপুরের আগে বাদী (ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের) নারাজি আবেদন দাখিল করেন। নারাজির আবেদনের ওপর শুনানির সময় আল জাবের ও তাঁর আইনজীবীরা আদালতকে এসব কথা বলেন। দুপুর ১২টার পর আবদুল্লাহ আল জাবেরের উপস্থিতিতে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালতে নারাজি আবেদনের ওপর শুনানি হয়।
শুনানিতে বাদী বলেন, এ মামলায় ৬ জানুয়ারি অভিযোগপত্র দাখিল করেন ডিবি পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ। অভিযোগপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল করতে এবং দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের লোকজন হাদিকে হত্যার ঘটনা ঘটিয়েছে। পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু মূল পরিকল্পনাকারী কারা তা শনাক্ত করতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তা। এমনকি ঘটনার মূল রহস্য কী, সেটা স্পষ্ট করে অভিযোগপত্রে কিছু বলা হয়নি।
বাদী বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডে আরও অনেকে জড়িত রয়েছে। অনেকের পরিকল্পনায় এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু মূল পরিকল্পনাকারী কারা, তা জানার জন্য আরও তদন্তের প্রয়োজন।’
বাদী আদালতকে আরও বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়নি। এ কারণেও অধিকতর তদন্ত প্রয়োজন।’
শুনানি শেষে আদালত বলেন, ‘যেহেতু এটি একটি স্পর্শকাতর মামলা ও চাঞ্চল্যকর মামলা। আপনারা নথি পর্যালোচনা করে নারাজি আবেদন করেছেন। আমারও একটু পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। নথি পর্যালোচনা করে পরে আদেশ দেওয়া হবে।’
এদিকে শুনানিতে বাদীর আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘ডিবি পুলিশ তদন্ত করে একটি হাস্যকর প্রতিবেদন দিয়েছে। একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের পরিকল্পনা এবং খুনিদের পালাতে সহযোগিতার কথা চার্জশিটে বলা হয়েছে। এটা রীতিমতো হাস্যকর। মূল পরিকল্পনাকারী ও মূল রহস্য উদ্ঘাটন ছাড়াই অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।’
আইনজীবী বলেন, এ মামলায় মূল শুটার ফয়সালসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৯ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদন এঁদের কেউই হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন। অথচ তাঁদের মামলায় জড়ানো হয়েছে।
আইনজীবী আরও বলেন, ‘শরিফ ওসমান বিন হাদি বারবার ন্যায়বিচারের কথা বলতেন। তিনি বলতেন, তাঁকে যদি মেরে ফেলে সেটারও যেন ন্যায়বিচার হয়। এ জন্য আমরা ন্যায়বিচারের স্বার্থে এ নারাজি দিয়েছি। প্রকৃত অপরাধী যেন বিচারের আওতা-বহির্ভূত না হয়। যারা অপরাধ করেনি, তারা যেন শাস্তি না পায়।’
এর আগে, ১২ জানুয়ারি চার্জশিটের গ্রহণযোগ্যতা শোনানি ও বাদীর আপত্তি আছে কি না—সে বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য ছিল। ওই দিন বাদী চার্জশিট পর্যালোচনা করার সময় চাইলে আদালত আজ দিন ধার্য করেন।
৬ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন।
চার্জশিটভুক্ত ১৭ আসামির মধ্যে বর্তমানে ১১ জন কারাগারে রয়েছেন। প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদসহ ছয়জন পলাতক রয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তা পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেছেন চার্জশিটে।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে প্রচার চালাচ্ছিলেন ওসমান হাদি। ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের কিছু পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে মোটরসাইকেল থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশায় থাকা ওসমান হাদিকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। তাঁকে মাথায় গুলি করার পর আততায়ীরা মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়। পরে হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে ১৮ ডিসেম্বর মারা যান তিনি।
হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত ১৪ ডিসেম্বর পল্টন থানায় আবদুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে মামলা করেন। হাদির মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।