রাজধানীর রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার ঘটনায় করা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি দীর্ঘ ২৫ বছরেও। ওই ঘটনায় করা হত্যা মামলার বিচার বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টে শেষ হয়েছে। তবে বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে করা অন্য মামলাটি এখনো ঢাকার মহানগর ১৫ নম্বর বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন।
২০০১ সালে রমনা বটমূলে পয়লা বৈশাখে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে জঙ্গিদের বোমা হামলায় নিহত হন ১০ জন। আহত হন অনেকে। এ ঘটনায় ওই দিনই পুলিশ বাদী হয়ে রমনা থানায় মামলা করে। এর প্রায় আট বছর পর ২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর দুটি মামলাতেই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) শীর্ষনেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ১৪ জঙ্গির বিরুদ্ধে আদালতে দুটি অভিযোগপত্র দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। একটি অভিযোগপত্র দেওয়া হয় হত্যা মামলায় এবং অন্যটি বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে।
২০১৪ সালের ২৩ জুন ঢাকার দায়রা জজ আদালত হত্যা মামলার রায়ে মুফতি হান্নানসহ আটজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আটজন হলেন মুফতি হান্নান, মো. তাজউদ্দিন, আকবর হোসেন, আরিফ হাসান সুমন, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, আবদুল হাই ও শফিকুর রহমান। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত ছয়জন হলেন শাহাদাত উল্লাহ জুয়েল, সাব্বির, শেখ ফরিদ, আবদুর রউফ, ইয়াহিয়া ও আবু তাহের।
এরপর ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) যায় হাইকোর্টে। অন্যদিকে খালাস চেয়ে আপিল করেন আসামিরা। দীর্ঘ শুনানি শেষে গত বছরের ১৩ মে রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে দুজনকে যাবজ্জীবন ও নয়জনকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারিক আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত মুফতি হান্নানের অন্য একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় এবং আবদুর রউফ ও ইয়াহিয়া মারা যাওয়ায় তাঁদের আপিল পরিসমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আটজনের মধ্যে মো. তাজউদ্দিনকে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন হাইকোর্ট। তিনি বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই। শাহাদাত উল্লাহ জুয়েলের যাবজ্জীবন বহাল রাখেন হাইকোর্ট।
রায়ের পর থেকে পলাতক তাজউদ্দিন ও হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর। হাইকোর্টে ১০ বছর সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে আকবর হোসেন ও আবু তাহের সাজাভোগ শেষে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এই মামলায় ১০ বছর সাজার মেয়াদ পূর্ণ হলেও অন্য মামলা থাকায় মুক্তি পাননি বাকি পাঁচজন।
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো প্রকাশিত হয়নি। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে আপিলের কথা জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। হাইকোর্টে দুই আসামির পক্ষে থাকা সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে তাঁরা আপিল করবেন। আপিলের পর বিষয়টি আপিল বিভাগে নিষ্পত্তি হবে। তাই দ্রুত পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হবে বলে আশা তাঁর।
বিস্ফোরক আইনের মামলা
রমনা বটমূলে বোমা হামলার ঘটনায় করা বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলায় ২০১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ মুফতি হান্নানসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন। এ মামলার বাকি আসামিরা হলেন তাজউদ্দিন, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মুফতি আব্দুল হাই, শফিকুর রহমান, আবু বকর, সেলিম হাওলাদার, আরিফ হাসান সুমন, আকবর হোসাইন, শাহাদাৎ উল্লাহ জুয়েল, আবু তাহের, সাব্বির ও শওকত ওসমান। তাঁদের মধ্যে তাজউদ্দিন, আবদুল হাই ও জাহাঙ্গীর পলাতক।
২০২২ সালের ২১ মার্চ এই মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। রাষ্ট্রপক্ষে মোট ৮৪ সাক্ষীর মধ্যে ৫৪ জনের সাক্ষ্য নেন আদালত। ওই বছরের ৩ এপ্রিল আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের ও ১১ আগস্ট যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য করা হয়েছিল। তবে ২০২২ সালের ২৮ জুলাই ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল মামলাটি মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ফেরত পাঠান। পরে পাঠানো হয় ১৫ নম্বর বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। এরপর মামলার বিচারকাজ একই অবস্থানে রয়েছে।
এই মামলার বিষয়ে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, মামলার বিভিন্ন আসামি হাইকোর্টে বিভিন্ন ধরনের আবেদন করার কারণে কার্যক্রম কিছুদিন স্থগিত ছিল। বর্তমানে স্থগিতাদেশ নেই। মামলাটি আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি হবে বলে তিনি আশাবাদী।