অনেকটা পাগলের মতো আচরণ করলেও খুব ঠান্ডা মাথায় এক বৃদ্ধা, এক নারী, এক কিশোরীসহ ছয়জনকে খুন করেছেন মশিউর রহমান ওরফে সম্রাট (৪০)। এসব খুনের ঘটনায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর আজ সোমবার (১৯ জানুয়ারি) ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
আদালত পুলিশ পরিদর্শক কামাল হোসেন জানান, সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাজী তাজুল ইসলাম সোহাগ ওই ব্যক্তির জবানবন্দি নেন। পরে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। জবানবন্দিতে সম্রাট ছয়জনকে খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। এর আগে পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট এসব খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।
গতকাল রোববার সাভারের পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনের ভেতর থেকে এক কিশোরীসহ দুটি লাশ উদ্ধার হয়। এরপর ওই দিন বিকেলে সাভার থানার সামনে থেকে সম্রাটকে আটক করে পুলিশ। ওই ভবনের সামনে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখে সম্রাটকে আটক করা হয়। এরপরই সিরিয়াল খুনের সঙ্গে সম্রাটের জড়িত থাকার বিষয়টি সামনে আসে।
সাভার পৌর এলাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টার, যা একসময় ছিল সামাজিক অনুষ্ঠান ও জনসমাগমের কেন্দ্র। সেই কমিউনিটি সেন্টারটি এখন পরিত্যক্ত। এ নিয়ে গতকাল আজকের পত্রিকায় একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়। সাভার থানার বরাতে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের ২৯ আগস্ট প্রথম কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলা থেকে এক যুবকের হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই বছরের ১১ অক্টোবর একই স্থানে এক নারীর লাশ পাওয়া যায়। এর প্রায় দুই মাস পরে ১৯ ডিসেম্বর আরও এক ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায়।
গতকাল সাভার থানার পরিদর্শক (অপারেশনস) হেলাল উদ্দিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, আগের তিনটি লাশ উদ্ধারের ঘটনায় মামলা হলেও ইতিপূর্বে কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এমনকি নিহত ব্যক্তিদের পরিচয়ও জানা যায়নি। এই প্রথম গত শনিবার রাতের ঘটনার পর একজনকে আটক করা সম্ভব হয়েছে।
আটক ওই ব্যক্তি সম্রাট। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত শনিবার রাতে সম্রাট কমিউনিটি সেন্টারের ভেতর থেকে টেনেহিঁচড়ে একটি লাশ বের করে আনেন। এরপর কাঁধে করে লাশটি সেন্টারের পেছন দিক দিয়ে ভেতরে নিয়ে যান।
শনিবার রাতে কমিউনিটি সেন্টারের ভেতরে খুনের ঘটনায় সাভার থানার উপরিদর্শক (এসআই) সাখাওয়াত ইমতিয়াজ বাদী হয়ে গতকাল রাতে থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় সম্রাটকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আজ তাঁকে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে সোপর্দ করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানানো হয়। দুপুরে সাভার থানা চত্বরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ঢাকার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস অ্যান্ড ট্রাফিক উত্তর) আরাফাতুল ইসলাম এসব তথ্য দেন।
যদিও রিমান্ডে নেওয়ার আগেই সম্রাট আদালতের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
আরাফাতুল ইসলাম জানান, সম্রাট পাগলের মতো আচরণ করলেও তিনি পাগল নন। সাইকো টাইপের এই সম্রাট একে একে ছয়টি খুন করেছেন। তাঁর পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায়নি। প্রত্যেককেই শ্বাসরোধ করে হত্যার পর তিনজনের লাশ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেন। তাঁদের মধ্যে মাত্র একজনের পরিচয় পাওয়া গেছে।
আরাফাতুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক তদন্তের তথ্য অনুযায়ী সম্রাট প্রথম খুন করেন ২০২৫ সালের ৪ জুলাই। ওই রাতে সাভার মডেল মসজিদের সামনে আসমা বেগম নামের এক বৃদ্ধকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। পরে ওই বছরের ২৯ আগস্ট সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনের ভেতরে এক যুবককে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে দেন। এর প্রায় এক মাস পর ১১ অক্টোবর আরও এক নারীর লাশ উদ্ধার হয় কমিউনিটি সেন্টারের ভেতর থেকে। তাঁকেও সম্রাট হত্যা করেন বলে জানিয়েছেন। গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর ওই কমিউনিটি সেন্টারের ভেতরে আরও এক যুবককে হত্যা করেন সম্রাট। সর্বশেষ গত শনিবার রাতে এক কিশোরীসহ দুজনকে হত্যার পর তাঁদের দেহ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেন।
সাভার থানার পরিদর্শক (অপারেশনস) হেলাল উদ্দিন বলেন, কমিউনিটি সেন্টারের ভেতরে যাঁদের হত্যা করা হয়েছে, তাঁদের প্রায় সবাই ভবঘুরে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গতকাল আরও এক ভবঘুরে নারীকে কমিউনিটি সেন্টারে দেখা যায়। সম্রাট তাঁকেও ওই রাতে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন।
হেলাল উদ্দিন আরও বলেন, সম্রাট দেড় বছরের বেশি সময় ধরে থানার আশপাশে ঘোরাফেরা করতেন। একেক দিন একেক রকম পোশাক পরতেন। তিনি কিছুটা অগোছালো কথাবার্তা বলতেন, এ কারণে সবাই তাঁকে পাগল মনে করতেন। আসলে তিনি পাগল নন।