সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির নেত্রী নিপুণ রায় চৌধুরী বলেছেন, স্মার্ট প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে দেশে সাইবার বুলিং, অনলাইনে হয়রানি ও শিশুদের নিয়ে অশ্লীল কনটেন্ট তৈরির মতো অপরাধ বহুগুণে বেড়েছে। ফলে শিশুরা এখন চার দেয়ালের মধ্যেও নিরাপদ নয়।
শনিবার রাজধানীর শাহবাগে শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টার মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ সব কথা বলেন। ‘নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্য সহায়তা সেল’ এই বৈঠকের আয়োজন করে।
নিপুণ রায় বলেন, বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, করোনাকালের পর থেকে দেশে শিশুদের ওপর সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ শিশু নির্যাতনের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিচিত ব্যক্তি কিংবা নিকটাত্মীয়দের হাতেই শিশুরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক পরিবার শিশুদের কাজে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে। গৃহকর্মী ও শিশু শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত শিশুরা প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ না হওয়াকে শিশু সুরক্ষার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন নিপুণ রায়। তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, শিশু আইন-২০১৩ এবং জাতীয় শিশু নীতিসহ প্রয়োজনীয় আইন থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। সামাজিক লজ্জা ও ‘লোকে কী বলবে’—এই মানসিকতার কারণে অনেক পরিবার নির্যাতনের ঘটনা গোপন রাখে। এতে অপরাধীরা পার পেয়ে যায় এবং নতুন অপরাধে উৎসাহিত হয়।
বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন নিপুণ রায়। তিনি বলেন, বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে। সাক্ষী সুরক্ষার অভাব ও প্রমাণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে দণ্ডের হার অত্যন্ত হতাশাজনক।
শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ শুধু সরকারের একক দায়িত্ব নয় বলে উল্লেখ করেন নিপুণ রায়। তিনি বলেন, পরিবার, রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজ—সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিবারকে শিশুদের ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা নির্ভয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা অভিভাবকদের জানাতে পারে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রতি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবমুক্ত দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজকে অপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট এবং ভুক্তভোগী শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিপুণ রায় একটি জাতীয় শিশু সুরক্ষা ড্যাশবোর্ড চালুর প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, বিদ্যমান ১০৯৮ শিশু সহায়তা হেল্পলাইনে পাশাপাশি একটি সমন্বিত মোবাইল অ্যাপ চালু করা যেতে পারে, যেখানে শিশু বা তার অভিভাবক ভিডিও, অডিও কিংবা লিখিত অভিযোগ সরাসরি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে পারবেন।
এ ছাড়া প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে স্থানীয় শিক্ষক, যুবসমাজ, ইমাম ও পুরোহিতদের নিয়ে শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন, স্কুলে ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, প্রতিটি থানায় শিশুবান্ধব কর্নার স্থাপন এবং শিশু নির্যাতনের মামলার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।
নিপুণ রায় বলেন, একটি শিশু যখন নির্যাতিত হয়, তখন শুধু তার শরীর নয়; একটি পুরো ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই রাষ্ট্রের উন্নয়নের কোনো অর্থ থাকে না।
তিনি বলেন, শিশুদের জন্য এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে তাদের শৈশব কাটবে হাসি, খেলার মাঠ ও বইয়ের পাতার সঙ্গে; ভয়ের মধ্যে নয়।
গোলটেবিল বৈঠকে আইনজীবী, চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর আইন প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।