ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে মানব পাচার মামলায় তৃতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। আজ শনিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলম এই নির্দেশ দেন।
রাজধানীর পল্টন থানায় দায়ের করা মানব পাচার আইনে একটি মামলায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে ছয় দিনের রিমান্ডে শেষে আদালতে হাজির করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. রায়হানুর রহমান আবারও চার দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তিন দিন রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গত ২৯ মার্চ তাঁকে দ্বিতীয় দফায় ছয় দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। এর আগে ২৪ মার্চ মাসুদ উদ্দিনকে এই মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।
এর আগে ২৩ মার্চ গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার ২ নম্বর লেনের ১৫৩ নম্বর বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে মানব পাচার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, রিক্রুটিং এজেন্সি আফিয়া ওভারসিজের স্বত্বাধিকারী আলতাব খান ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পল্টন মডেল থানায় সাবেক প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমেদ, সচিব আহমেদ মুনিরুস সালেহীন, সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, তাঁর স্ত্রী কাশ্মীরি কামাল, মেয়ে নাফিসা কামাল, সাবেক এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী, সাবেক এমপি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও বেনজির আহমেদসহ ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে একটি মানব পাচার মামলা দায়ের করেন। মামলায় তাঁদের বিরুদ্ধে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ২৪ হাজার কোটি টাকা পাচার ও আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।
মামলার বাদী আলতাব খান অভিযোগে বলেন, মালয়েশিয়ায় অনেক বাংলাদেশি কর্মীকে শোষিত, আটক ও বেকার করা হয়েছিল এবং তাঁদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছিল—এগুলো সবই মানব পাচারের লক্ষণ। আফিয়া ওভারসিজসহ বাংলাদেশের অনেক রিক্রুটিং এজেন্সিও বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায়কারী সিন্ডিকেটের কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়, আসামিরা পরস্পরের যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ অর্থ চাঁদা হিসেবে নিয়েছেন।
মামলাটি তদন্তের পর গত বছর সিআইডির হিনিয়াস ক্রাইম বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক মো. রাসেল মামলাটি মিথ্যা বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ সব আসামির অব্যাহতি চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। এ ছাড়াও মিথ্যা মামলা করায় বাদীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির মো. রাসেল চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলেন, মামলার বাদী সরাসরি ভুক্তভোগী নন। এই মামলায় ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা হলেন শ্রমিক। মালয়েশিয়ায় ৪ লাখ ৭৬ হাজার শ্রমিক যাঁরা গিয়েছিলেন, তাঁদের কেউই মামলার বাদীকে টাকা দেননি। ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির কাছে না গিয়ে অন্তত ৩ হাজার এজেন্সির কাছে টাকা দিয়েছিলেন। তাঁদের কেউ ৪ লাখ টাকা, কেউ সাড়ে ৪ লাখ টাকা, আবার কেউবা ৫ লাখ টাকা দিয়ে থাকলেও তাঁরা প্রত্যেকে ৭৮ হাজার টাকা প্রদানের নথিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। যদি তাঁরা বেশি অর্থ প্রদান করেন, তাহলে তাঁদের নিজেদেরই অভিযোগ দায়ের করতে হবে। এখন পর্যন্ত একজন ভুক্তভোগীও অভিযোগ করেননি। মামলায় যথাযথ প্রমাণের অভাব রয়েছে।
তৃতীয় দফার রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, ছয় দিনের রিমান্ডে আসামিকে অতি সতর্কতার সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু সময় স্বল্পতার কারণে মানব পাচার ও অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদে আসামির কাছ থেকে পুরোপুরি তথ্য পাওয়া যায়নি।
আরও বলা হয়, আসামি এজেন্সির মাধ্যমে পাঠানো যাত্রীদের মধ্যে কতজন ফেরত এসেছেন তার তথ্য, মেডিকেল ফি বাবদ কত টাকা নিয়েছেন, পলাতক আসামি গ্রেপ্তার, আত্মসাৎ টাকা উদ্ধার এবং ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার ডকুমেন্টগুলো পর্যালোচনার জন্য আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ফের চার দিনের রিমান্ড একান্ত প্রয়োজন।
যা বললেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী
এক-এগারোর সময়ের আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী আদালতে হাজির হওয়ার সময় তাঁর হাতে হাতকড়া পরানো নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মামলার শুনানি শেষে এজলাস থেকে নামার সময় নিজের আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীনকে উদ্দেশ করে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘দেশপ্রেমের এই নমুনা—আজ আমার হাতে হাতকড়া। আমি দেশের জন্য কাজ করেছি, মানুষের জন্য কাজ করেছি। সেই দেশপ্রেমের কারণেই আজ আমাকে হাতকড়া পরানো হয়েছে। মামলাগুলো হয়রানি ও হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য করা হয়েছে।’
অন্য তথ্য উদ্ঘাটনে বারবার রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছ, দাবি বিবাদীর আইনজীবীর;
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মামলার তথ্য নয় অন্য তথ্য উদ্ঘাটনে ব্যস্ত। রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানির সময় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর আরেক আইনজীবী তৌহিদুল ইসলাম সজীব এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, আত্মসাতের টাকা উদ্ধার করা এই মামলায় রিমান্ডে নেওয়ার কারণ হতে পারে না।
আসামিপক্ষের আইনজীবী শুনানিতে আরও বলেন, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বয়স ৭২ বছরের বেশি, তিনি অসুস্থ এবং ব্রেইন সার্জারি ও হার্টে রিং বসানো হয়েছে। তবু বারবার রিমান্ডে নিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে তাদের মনমতো কথা স্বীকার করানোর জন্য।