দুই হাতেরই কবজি নেই জান্নাতুল ফেরদৌস নিপার। কবজিবিহীন হাত দিয়ে লিখে চালিয়ে যাচ্ছেন পড়ালেখা। কবজি না থাকলেও হাতের লেখা সুন্দর তাঁর। করেছেন ভালো ফলাফলও। নিপা জেএসসি পরীক্ষায় পেয়েছেন ৪.৬৯। আর ২০২০ সালের এসএসসি পরীক্ষায় পেয়েছেন জিপিএ ৪.৭২।
নিপা তাঁর মায়ের সঙ্গে সাভার উপজেলার ডেন্ডাবের গ্রামে বসবাস করেন। তাঁদের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার মানিকপুরে। ২০১৪ সালের ১৫ জানুয়ারি বাড়ির ছাদের বৈদ্যুতিক তারে হাত জড়িয়ে যায় নিপার। এরপর দুই মাসের মাথায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা তাঁর দুই হাতের কবজি কেটে ফেলতে বাধ্য হন। তখন ক্লাস ফাইভে পড়তেন। পড়াশোনার প্রবল ইচ্ছা থাকায় আটকানো যায়নি তাঁকে। দুর্ঘটনার কয়েক দিন পরই পিইসি পরীক্ষা। পিইসিতে এক সহযোগীর মাধ্যমে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন তিনি।
এর পর থেকে কনুই দিয়ে কলম ধরে লেখার অনুশীলন শুরু করেন নিপা। কিছুদিন পরই এভাবে লেখা আয়ত্তে চলে আসে। এখন তাঁর হাতের লেখা দেখলে কেউ বলতে পারবে না যে এই লেখা আঙুলের ছোঁয়া পায়নি।
দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার দুই বছর আগে বিবাহবিচ্ছেদ হয় নিপার মা–বাবার। সেই থেকে মা নিলুফা বেগম মেয়েকে নিয়ে বোনের বাড়ি সাভারে থাকেন। নিপার বাবা জাহাঙ্গীর আলম থাকেন নোয়াখালীতে। তিনি কৃষিকাজের পাশাপাশি চা বিক্রি করেন। যে খালুর বাড়িতে নিপা থাকেন, সেই খালু থাকেন সৌদি আরবে। তিনিই দেন নিপার ভরণপোষণ ও পড়ালেখার খরচ।
অদম্য মেধাবী নিপাকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেন দৈনিক আগামীর সংবাদের সম্পাদক ও প্রকাশক মোহাম্মদ আব্দুস সালাম রুবেল। এরপর অনেকেই তাঁকে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসেন। আব্দুস সালাম রুবেলের মাধ্যমে সাভারের বেপজা কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন নিপা।
সম্প্রতি নিপার পাশে দাঁড়িয়েছেন সাভার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম রাজীব। নিপার পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। ইতিমধ্যে তাঁকে নগদ ১৫ হাজার টাকা এবং পড়াশোনার জন্য প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রাজীব।
মঞ্জুরুল আলম রাজীব বলেন, ‘জান্নাতুল আমার সামনে লিখে দেখিয়েছে। ওর লেখা দেখে আমি মুগ্ধ। ওর ইচ্ছাশক্তিতে আমি অবাক। আমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব, আমি তাকে সাহায্য করে যাব।’
জান্নাতুল ফেরদৌস নিপা বলেন, ‘আমার যখন হাত কেটে ফেলে দিল, খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। কীভাবে লেখাপড়া চালিয়ে যাব তা নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। তবু মনে মনে সংকল্প করি, আমাকে এগিয়ে যেতে হবে। তাই কষ্ট হলেও আমি লেখার চেষ্টা করতাম। এখন লিখতে তেমন অসুবিধা হয় না। সময় একটু বেশি লাগে। আমি ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করতে চাই। এত দিন যাঁরা আমাকে সহায়তা করেছেন, তাঁদের অসংখ্য ধন্যবাদ।’