ঢাকঢোলের গর্জন, কাঁসরের শব্দ আর লাঠির ঝলকে এক দিনের জন্য যেন ফিরে এল গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া জীবন্ত ঐতিহ্য। মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বৈশাখী মেলা ঘিরে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা পরিণত হয় শিকড়ের টানে ছুটে আসা মানুষের মিলনমেলায়।
চার দিনব্যাপী মেলার শেষ দিন আজ সোমবার বিকেলে সিংজুরী বীণাপাণি সমাজকল্যাণ মাঠে নেমে আসে মানুষের ঢল। দূরদূরান্ত থেকে আসা নারী, পুরুষ ও শিশুর উপস্থিতিতে মাঠ মুহূর্তে রূপ নেয় জনসমুদ্রে। কারও কোলে শিশু, কেউ এসেছেন পরিবার নিয়ে, কেউবা বন্ধুবান্ধব মিলে এসেছেন হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের মুখোমুখি হতে।
মাঠের মাঝখানে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কান্দা কুষ্টিয়া এলাকার আয়নাল এবং দৌলতপুর উপজেলার কাকরাইদ গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের লাঠিয়ালের দল। শুরু হলো লড়াই। লাঠির আঘাত, প্রতিঘাত, দ্রুত পায়ের চলন আর ঘূর্ণিতে তৈরি হয় রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা। ঢাকঢোলের তালে তালে লাঠিয়ালদের কৌশল আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। দর্শকেরা নিশ্বাস আটকে দেখেন, আর মুহূর্তেই করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মাঠ।
খেলা দেখতে আসা ঘিওর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক নূরে আলম বলেন, ‘এ ধরনের আয়োজন আমাদের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার খুব ভালো উদ্যোগ। আজকের শিশুরা প্রযুক্তির ভেতরে ডুবে যাচ্ছে, তাদের জন্য এমন খেলা দেখা সত্যিই প্রয়োজন।’
সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের শিক্ষার্থী তাহমিনা তাবাসসুম বলেন, ‘প্রথমবার কাছ থেকে লাঠিখেলা দেখলাম। খুব রোমাঞ্চকর লেগেছে। আগে শুধু গল্প শুনতাম, আজ বুঝলাম আমাদের গ্রামবাংলার সংস্কৃতি কতটা সমৃদ্ধ। এমন আয়োজন আরও হওয়া উচিত।’
খেলা দেখতে দেখতে কথা হয় প্রবীণ লাঠিয়াল সর্দার আব্দুস সামাদের সঙ্গে। বয়সের ভার থাকলেও কণ্ঠে স্পষ্ট আত্মবিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘এই লাঠিখেলা আমাদের বাপ-দাদার স্মৃতি। ঐতিহ্য ধরে রাখতেই খেলি। কিন্তু আমরা অধিকাংশই দরিদ্র অবস্থায়। সরকারি সহযোগিতা পেলে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও চর্চার মাধ্যমে এই খেলাকে আরও বড় পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব।’
মেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুর রহিম বলেন, ‘লাঠিখেলা আমাদের শিকড়ের অংশ। এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য শুধু বিনোদন নয়, নতুন প্রজন্মকে গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করানো, সুস্থ বিনোদনের সুযোগ তৈরি করা এবং মোবাইল ও মাদকাসক্তি থেকে দূরে রাখাই উদ্দেশ্য। প্রতিবছর আরও বড় পরিসরে এই আয়োজন করতে চাই।’
দুপুর গড়াতেই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। শিশুদের কৌতূহল, তরুণদের উচ্ছ্বাস আর প্রবীণদের স্মৃতিমাখা হাসিতে পুরো এলাকা পরিণত হয় এক উৎসবে। সন্ধ্যার আলো নেমে এলে বন্ধ হয় লাঠিখেলা। মাঠজুড়ে তখনো চলে ঢাকের তাল আর দর্শকদের উচ্ছ্বাস। খেলা শেষ হলেও রয়ে যায় এক গভীর অনুভব— গ্রামবাংলার ঐতিহ্য হারায়নি, তা আজও বেঁচে আছে মানুষের হৃদয়ের গভীরে।