• বিশেষ করে জন্মগত হৃদ্রোগে আক্রান্ত শিশুদের অস্ত্রোপচারের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে।
• অপারেশন থিয়েটারের সংকটে অস্ত্রোপচার কম করা যাচ্ছে।
• বাড়তি সময় হাসপাতালে ভর্তি থাকায় বাড়ছে খরচ ও মানসিক চাপ।
দেশে হৃদ্রোগ চিকিৎসায় সরকারের একমাত্র বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (এনআইসিভিডি)। অথচ সেখানেই হৃৎপিণ্ডের অস্ত্রোপচারের জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে রোগীদের। বিশেষ করে জন্মগত হৃদ্রোগে আক্রান্ত শিশুদের অস্ত্রোপচারের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে। অপারেশন থিয়েটার (ওটি) বা অস্ত্রোপচারকক্ষের সংকটে চাহিদার তুলনায় কম অস্ত্রোপচার করা যাচ্ছে। ফলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন থাকা অনেক রোগীকে মাসের পর মাস হাসপাতালে ভর্তি থেকে এর জন্য অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।
শুধু শিশু নয়, বড়দের হৃৎপিণ্ডের অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রেও এক মাস বা তার বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এই সময় তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি থাকায় চিকিৎসার পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের দৈনন্দিন খরচ এবং মানসিক চাপ বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হৃদ্রোগ চিকিৎসায় সরকারের বিশেষায়িত এই প্রতিষ্ঠানের শয্যাসংখ্যা ১ হাজার ২৫০। গত বছর হাসপাতালটির বহির্বিভাগে সোয়া দুই লাখের বেশি রোগী চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছেন। জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন পৌনে ২ লাখ এবং ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১২ হাজার রোগী। বছরজুড়ে হাসপাতালে মারা গেছেন ৫ হাজার ৯০৯ জন। বড় অস্ত্রোপচার হয়েছে ১ হাজার ৯৭২টি এবং ছোট অস্ত্রোপচার ১৬ হাজার ২৬৯টি। শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তির হার ছিল ১২০ শতাংশ।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এই হাসপাতাল। এখানে প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের হৃদ্রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি কার্ডিয়াক সার্জারি, পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি, ভাসকুলার সার্জারি, অ্যানেসথেসিওলজি, রেডিওলজি ও ইমেজিং, প্যাথলজি, ব্লাড ব্যাংক এবং ফিজিক্যাল মেডিসিন, রিহ্যাবিলিটেশনসহ ১১টি বিভাগ রয়েছে। হৃদ্রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন পরীক্ষা, জরুরি চিকিৎসা, এনজিওগ্রাম, ক্যাথল্যাবভিত্তিক ইন্টারভেনশন, হৃদ্যন্ত্রের অস্ত্রোপচার এবং শিশুদের জন্মগত হৃদ্রোগের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার এখানে করা হয়। পাশাপাশি এমডি (কার্ডিওলজি), এমএস (কার্ডিওভাসকুলার অ্যান্ড থোরাসিক সার্জারি), ডিপ্লোমা ইন কার্ডিওলজি (ডি-কার্ড)সহ উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এনআইসিভিডিতে মোট ১০টি ওটি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে কার্ডিয়াক সার্জারির জন্য ৭টি এবং ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের ৩টি। তবে কার্ডিয়াক সার্জারির ৭টির মধ্যে ২টি ওটির লাইফটাইম (ব্যবহারের নির্ধারিত সময়সীমা) শেষ হয়ে যাওয়ায় সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে কার্যত ৫টি ওটি দিয়ে অস্ত্রোপচার চলছে। এগুলোর মধ্যে শিশু কার্ডিয়াক সার্জারির জন্য ১টি, অ্যাডাল্ট কার্ডিয়াক সার্জারির জন্য ৩টি এবং ইনফেকশন কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (আইপিসি) জন্য ১টি ওটি রয়েছে।
এসব ওটিতে বিভিন্ন ইউনিট পালা করে অস্ত্রোপচার করে। কার্ডিয়াক সার্জারিতে ১০টি, শিশু কার্ডিয়াক সার্জারিতে ২টি এবং ভাসকুলার সার্জারিতে ৪টি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের নেতৃত্বে থাকেন একজন অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপক।
চাঁদপুর থেকে দুই বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে এনআইসিভিডিতে এসেছেন এক ব্যক্তি। ৫ অক্টোবর শিশুটিকে হাসপাতালের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের শিশু কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগে ভর্তি করানো হয়। তার ওপেন হার্ট সার্জারি করার কথা। তবে অস্ত্রোপচারের জন্য দুই মাসের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে চিকিৎসকদের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন তিনি। শিশুটিকে ভর্তি করাতে গত আগস্টের শুরুতে এনআইসিভিডিতে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু শয্যা খালি না থাকায় তখন ভর্তি করাতে পারেননি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর শিশুটিকে ভর্তি করানো সম্ভব হয়েছে।
পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার গোসাই গ্রামের সাত বছর বয়সী একটি শিশু গত ৩১ আগস্ট একই ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে। জন্মগত হৃদ্রোগে আক্রান্ত শিশুটির হৃৎপিণ্ডের ওপরের দুটি প্রকোষ্ঠের মাঝের দেয়ালে ছিদ্র রয়েছে, যাকে সাইনাস ভেনোসাস অ্যাট্রিয়াল সেপটাল ডিফেক্ট (এসভিএএসডি) বলা হয়। পাশাপাশি ফুসফুস থেকে হৃৎপিণ্ডে রক্ত ফেরানোর রক্তনালির অস্বাভাবিক সংযোগ—পার্শিয়াল অ্যানোম্যালাস পালমোনারি ভেনাস কানেকশন (পিএপিভিসি) রয়েছে। ফলে ডান ফুসফুসের একটি রক্তনালি স্বাভাবিক জায়গার পরিবর্তে অন্য স্থানে যুক্ত হয়েছে। তার ফুসফুসের ধমনিতেও রক্তচাপ কিছুটা বেশি, যাকে মৃদু পালমোনারি হাইপারটেনশন বলা হয়।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শিশুটির দ্রুত অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। তবে রোগীর চাপ বেশি থাকায় এখনো অস্ত্রোপচারের নির্দিষ্ট তারিখ পাওয়া যায়নি। স্বজনদের ধারণা, আরও এক মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শিশু কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগে ৪৪টি শয্যা রয়েছে। বিভাগের জন্য নির্ধারিত একটি ওটিতে দিনে একটি অস্ত্রোপচার করা হয়। শুক্রবার বাদে মাসে ২০ থেকে ২৪টি অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়। অস্ত্রোপচারের পর শিশুদের চিকিৎসার জন্য আলাদা আইসিইউতে রয়েছে ১০টি শয্যা। এগুলোর মধ্যে ৪টিতে ভেন্টিলেটর রয়েছে।
শিশু কার্ডিয়াক সার্জারির বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের যে সার্জন ও জনবল রয়েছে, তা দিয়ে আরও একটি ওটি চালানো যাবে।’
শিশুদের হৃদ্রোগের অস্ত্রোপচারের বড় একটি অংশই জন্মগত হৃদ্রোগের ত্রুটি সংশোধনের জন্য করা হয়। এর মধ্যে অ্যাট্রিয়াল সেপটাল ডিফেক্ট (এএসডি), ভেন্ট্রিকুলার সেপটাল ডিফেক্ট (ভিএসডি), টেট্রালজি অব ফ্যালট (টিওএফ) সংশোধন, আর্টেরিয়াল সুইচ এবং জটিল হৃদ্রোগে গ্লেন ও ফন্টান অপারেশন উল্লেখযোগ্য। রোগের ধরন ও জটিলতা অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে ক্যাথেটারভিত্তিক চিকিৎসাও দেওয়া হয়।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, হাসপাতালে পারফিউশনিস্ট, ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন ও অ্যানেসথেসিওলজি বিশেষজ্ঞের সংকট রয়েছে। পারফিউশনিস্টের ছয়টি পদ থাকলেও বর্তমানে কোনো পদেই পারফিউশনিস্ট নেই। হৃদ্যন্ত্রের অস্ত্রোপচারের সময় হার্ট-লাং মেশিনের মাধ্যমে শরীরে রক্ত ও অক্সিজেনের প্রবাহ সচল রাখার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেন পারফিউশনিস্ট। বর্তমানে হার্ট-লাং টেকনিশিয়ানদের দিয়েই এ কাজ চালানো হচ্ছে।
কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের ১০টি ইউনিটের অধীনে ১৫০টি শয্যা রয়েছে। ইউনিটভেদে শয্যা ১৪ থেকে ১৭টি। ভর্তি রোগীদের অস্ত্রোপচারের তারিখ পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। রোগীর শারীরিক জটিলতা বেশি হলে অপেক্ষার সময় আরও বাড়ে।
অ্যাডাল্ট কার্ডিয়াক সার্জারির জন্য তিনটি ওটি রয়েছে। এসব ওটিতে ১০টি ইউনিট পালা করে অস্ত্রোপচার করে। শুক্রবার বাদে মাসে প্রায় ৭০টি অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়। অন্য একটি ওটি ইনফেকশন কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (আইপিসি) জন্য নির্ধারিত।
বিভাগের অধীনে ৩৮টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে ২৪টি সচল; ভেন্টিলেটর রয়েছে ১১টিতে। পুরোনো অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে মাঝেমধ্যে অস্ত্রোপচার কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়। এতে কার্যকর ওটির সক্ষমতা কমে এবং অপেক্ষমাণ রোগীর চাপ আরও বাড়ে।
ভাসকুলার সার্জারি বিভাগে রয়েছে তিনটি ওটি। এর একটি জরুরি এবং দুটি নিয়মিত অস্ত্রোপচারের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই বিভাগে ধমনি, শিরাসহ রক্তনালির রোগের চিকিৎসা করা হয়। রক্তনালি সরু বা বন্ধ হয়ে যাওয়া, রক্ত জমাট, পায়ে রক্ত চলাচল কমে যাওয়া, অ্যানিউরিজম ও রক্তনালির আঘাতের মতো সমস্যায় অস্ত্রোপচার বা এন্ডোভাসকুলার পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনআইসিভিডির অন্তত পাঁচজন চিকিৎসক বলেন, ওটির সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে জটিল রোগীদের চিকিৎসায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে; বিশেষ করে যেসব রোগীর দ্রুত অস্ত্রোপচার প্রয়োজন, তাঁদের ক্ষেত্রে বিলম্বে জটিলতা আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
চিকিৎসকদের মতে, অপেক্ষমাণ রোগীর চাপ কমাতে অচল ওটি দ্রুত সচল করা, পুরোনো ওটি আধুনিকায়ন এবং অস্ত্রোপচারের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আইসিইউ, এইচডিইউ, প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির সক্ষমতাও বাড়ানো প্রয়োজন।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবদুল ওয়াদুদ চৌধুরী স্বীকার করেন, দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকলে চিকিৎসার ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সংক্রমণের ঝুঁকিও তৈরি হয়। একই সঙ্গে রোগীর স্বজনদের কর্মসময় নষ্ট হওয়ায় তাঁদের ওপরও বাড়তি চাপ পড়ে। তাহলে ওটির সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে না কেন—এই প্রশ্নে তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ওই সব ওটির লাইফটাইম শেষ হয়ে গেছে। আমরা নতুন তিনটি ওটি স্থাপনের জন্য ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) তৈরি করছি। ভাসকুলার সার্জারির উন্নয়নেও ডিপিপি তৈরি করা হচ্ছে।’
হাসপাতালের জনবলসংকটের বিষয়ে পরিচালক বলেন, সবচেয়ে বেশি সংকট চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগে। একটি হাসপাতাল ২৪ ঘণ্টা চালু রাখতে হয়। তিন শিফটে কাজ করতে হয়। প্রয়োজনীয় পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মী না থাকলে হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে।