অনেক হতাশার মধ্যে বিচারপ্রক্রিয়ায় আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন রাজধানীর পল্লবীতে ধর্ষণের শিকার শিশুটির বাবা। তিনি বলেছেন, ‘এত হতাশার মধ্যেও বিচারপ্রক্রিয়ায় আমি একটি আশার আলো দেখতে পেয়েছি। বাংলাদেশ সরকার দ্রুত বিচার শেষ করার যে আশ্বাস দিয়েছিল, তার প্রতিফলন আমি দেখতে পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, আমি আশা করি আগামীকালের (রোববার) রায় বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। একজন বাবা হিসেবে আমি সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করছি।’
আজ শনিবার রাজধানীর শাহবাগে শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টার মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এই বাবা বলেন, ‘আমি আমার বাচ্চা হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই। বাংলাদেশের আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করি। সেই শাস্তি যেন দ্রুত কার্যকর হতে দেখি, একজন বাবা হিসেবে এটাই আমার একমাত্র চাওয়া।’
এর আগে, গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনায় অংশ নিয়ে শিশুটির বাবা বলেন, ‘এক ফ্ল্যাটের এক দরজা থেকে আরেক দরজার দূরত্ব তিন ফুট। এই তিন ফুটের মধ্যেও যদি আমরা একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে শুধু সরকারকে দায়ী করলে হবে না। পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে আরও হাজার হাজার শিশু এমন নৃশংসতার শিকার হতে পারে।’
তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘আজ আমি একজন ধর্ষিতার বাবা হিসেবে পরিচিত। এই দায়ভার কে নেবে—আমি, সমাজ নাকি রাষ্ট্র? আমার সন্তানের এমন পরিণতির জন্য দায়ী কে?’
বক্তব্যের একপর্যায়ে একটি পাঁচ বছরের শিশুর প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, সম্প্রতি এক বাবা নিজের মেয়েকে নিয়ে তার বাসায় আসেন। কারণ, শিশুটি চরম মানসিক আঘাতের মধ্যে রয়েছে। মেয়েটি ‘ধর্ষণ’ শব্দটি শিখে গেছে এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেছে, ‘আংকেল, এই দরজার ভেতরে কী ধর্ষণ হয়েছে?’ এখন সে মায়ের আঁচল ছেড়ে এমনকি একা টয়লেটেও যেতে পারে না। এটি বাংলাদেশের শিশুদের বর্তমান মানসিক অবস্থার একটি উদ্বেগজনক চিত্র বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, ‘একটি সন্তানকে জন্ম দেওয়া থেকে বড় করে তোলা পর্যন্ত বাবা-মা অক্লান্ত পরিশ্রম, মায়া-মমতা ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে তাকে মানুষ করেন। কিন্তু সেই সন্তান যদি সমাজের নৃশংসতার শিকার হয়, তাহলে এর দায় শুধু পরিবারের নয়; সমাজ ও রাষ্ট্রকেও এর জবাবদিহি করতে হবে।’
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি একজন বাবা হিসেবে বাঁচতে চেয়েছিলাম। আপনারা যদি আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিতে না পারেন, তাহলে অন্তত এমন একটি সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলুন, যেখানে আর কোনো বাবা-মায়ের বুক খালি হবে না।’
এই বাবা জানান, ঘটনার পর তাঁর স্ত্রী গভীর ট্রমার মধ্যে রয়েছেন এবং তাঁকে সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করতে হচ্ছে। পরিবারের আরেক সন্তানকে নিয়েও তিনি আতঙ্ক ও শঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
তিনি বলেন, আলোচনা ও গোলটেবিল বৈঠক অনেক হয়, কিন্তু বাস্তবে সমস্যার সমাধান কতটা হয় সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো শিশুকে এমন ভয়াবহ নির্যাতন ও হত্যার শিকার হতে না হয়, সে জন্য কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্য সহায়তা সেল আয়োজিত এই গোলটেবিল বৈঠকে আইনজীবী, চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর আইন প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।