তথ্য গোপন করে প্রায় ১৬ বছর ধরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার ২০ নম্বর শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদে দায়িত্ব পালন করছেন মৌসুমী দস্তিদার। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিয়োগের সময় তিনি সরকারি বিধিমালার শর্ত ভঙ্গ করে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করেছিলেন।
জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী মৌসুমী দস্তিদারের স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার হাইদগাঁও এলাকার জনার্দ্দন ঠাকুরবাড়ি। মৌসুমী দস্তিদারের বাবা শশাংক দস্তিদার, মা রানী প্রভা দস্তিদার এবং স্বামীর নাম কাজল পাল বলে উল্লেখ রয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ২০০৮ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তিন পার্বত্য জেলা বাদে দেশের ৬১ জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তিতে আবেদনকারীর সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার শর্ত উল্লেখ ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, ওই শর্ত পূরণ না করেও মৌসুমী দস্তিদার কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার ৬ নম্বর ঘোলপাশা ইউনিয়নের সলাকান্দি গ্রামের বাসিন্দা পরিচয়ে আবেদন করেন এবং ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পান।
অনুসন্ধানে প্রতিবেদক সলাকান্দি গ্রামে গিয়ে মৌসুমী দস্তিদার বা তাঁর স্বামী কাজল পালের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাননি। স্থানীয়দের অনেকেই জানান, এ নামে কাউকে তাঁরা চেনেন না।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষক রাম প্রসাদ পাল বলেন, ‘মৌসুমী দস্তিদার আমাদের আত্মীয় হন।’ তবে তাঁর স্বামীর নাম জানতে চাইলে তিনি স্পষ্টভাবে কিছু বলতে চাননি। পরে তিনি জানান, মৌসুমী দস্তিদারের স্বামীর নাম জীবন কৃষ্ণ পাল এবং তাঁরা বর্তমানে কুমিল্লা শহরে বসবাস করেন। এ কারণে গ্রামের মানুষ তাঁদের চেনেন না।
অন্যদিকে, প্রতিবেশী গোলক চন্দ্র বলেন, ‘মৌসুমী দস্তিদার, কাজল পাল বা জীবন কৃষ্ণ পাল নামে এখানে কেউ বসবাস করেন না। এই নামগুলো আমরা প্রথম শুনলাম।’
চৌদ্দগ্রামে কর্মরত কয়েকজন শিক্ষক জানান, মৌসুমী দস্তিদার নিজেকে সলাকান্দি গ্রামের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দিলেও তাঁকে কখনো ওই এলাকায় দেখা যায়নি। তাঁর প্রকৃত ঠিকানা নিয়ে তাঁদের মধ্যেও সন্দেহ রয়েছে।
পরে অনুসন্ধানে জীবন কৃষ্ণ পালের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে দেখা যায়, সেখানে স্ত্রীর নাম হিসেবে উল্লেখ রয়েছে ‘কনিকা পাল’। এ বিষয়ে জীবন কৃষ্ণ পালের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে এক নারী ফোন রিসিভ করে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তীকালে একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, মৌসুমী দস্তিদার জাতীয় পরিচয়পত্রে যাঁকে স্বামী হিসেবে উল্লেখ করেছেন, সেই কাজল পালের বাড়ি যশোরে।
২০০৮ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ১৪ নম্বর ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। অভিযোগ রয়েছে, মৌসুমী দস্তিদার সেই তথ্য গোপন করে ভিন্ন পরিচয়ে চাকরি লাভ করেন।
এ বিষয়ে মৌসুমী দস্তিদারের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই না। প্রয়োজন হলে কর্তৃপক্ষকে জবাব দেব।’
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, ‘সরকারি নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হয়। বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জানলাম। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুনছুর আলী চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’