সোমবার (১১ মে) বিকেল ৫টা। সীতাকুন্ডে সোনার দোকানে কাজ করছিলেন দোকানমালিক সমর ভৌমিক ও কর্মচারী শ্যামল কান্তি শর্মা। ঠিক ওই সময়ে সমরের মোবাইল বেজে ওঠে। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কথা বলেন তাঁর বড় ভাই শ্রীকান্ত ভৌমিক অমর। তাঁকে উপজেলা ভূমি অফিসে আটকে রাখা হয়েছে জানানোর পাশাপাশি তাঁর ভাই সমরকে ভূমি অফিসে আসতে বলেন। সমর দোকান বন্ধ করে কর্মচারী শ্যামল কান্তি শর্মাকে নিয়ে উপজেলায় ছুটে যান।
তাঁরা উপজেলার ভেতরে থাকা জামে মসজিদ এলাকায় পৌঁছানোর পরপরই কথিত সাংবাদিক নামধারী একদল দুর্বৃত্ত সোনার দোকানের কর্মচারী শ্যামল কান্তি শর্মার ওপর চড়াও হয়। তারা নানা অশ্লীল গালিগালাজের পাশাপাশি মারধর করতে থাকে শ্যামলকে। একপর্যায়ে তারা পুলিশ ডেকে তাঁর হাতে হাতকড়া পরাতে বলে। পুলিশ এতে অসম্মতি জানালে তাঁকে স্বৈরাচারের দোসর আখ্যা দেয় এবং হাতকড়া পরাতে বাধ্য করে।
এরপর কথিত সাংবাদিকেরা শ্যামলকে মারতে মারতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে নিয়ে যায়। এ সময় সেখানে নামজারিতে সনদ-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে আটকে রাখা শ্রীকান্ত ভৌমিক অমরও অবস্থান করছিলেন। অমরের সঙ্গে তাঁকেও একই ঘটনায় গ্রেপ্তার করাতে ইউএনওর ওপর চাপ সৃষ্টি করে ওই গোষ্ঠী। এরপর নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে শ্যামলের হাতকড়া পরা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে নানা ধরনের মিথ্যা অপপ্রচার শুরু করে। এ সময় মবের চাপে বাধ্য হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমর ও শ্যামলকে থানা-পুলিশে সোপর্দ করেন।
ঘটনার ঘণ্টাখানেক পর নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে থাকা সিসিটিভি ফুটেজ দেখে মবের বিষয়টি নিশ্চিতের পর ইউএনও সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) শ্যামল কান্তি শর্মাকে ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেন। সেই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনার জন্য তাঁর পরিবারের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মবের শিকার সোনার দোকানের কর্মচারী শ্যামল কান্তি শর্মা জানান, মালিকের কথায় দোকান বন্ধ করে তাঁর সঙ্গে উপজেলায় যান তিনি। উপজেলা জামে মসজিদের সামনে দাঁড়ানোর পর জাহেদুল আনোয়ার চৌধুরী, সোলায়মান মেহেদী, ফারহান সিদ্দিক, মহিউদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন কথিত সাংবাদিক তাঁকে লক্ষ্য করে অশালীন ভাষায় গালমন্দ করতে থাকেন। একপর্যায়ে জাহেদুল আনোয়ার চৌধুরী ও সোলায়মান মেহেদী ‘মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই শালা সীতাকুণ্ড প্রেসক্লাবের এক সাংবাদিকের ভাই, তাকে ধর, মিথ্যে মামলায় ফাঁসিয়ে দে’ বলে দৌড়ে এসে মারধর করতে থাকেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও ইউএনও অফিসে আটক অমরের ছোট ভাই সমর ভৌমিক জানান, তাঁর বাবা ও চাচার নামে একটি জমি নামজারি করাতে ভূমি অফিসে ফাইল জমা দিয়েছিলেন জিয়া নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে। অনলাইন আবেদনের জন্য ফাইলে তার বড় ভাইয়ের মুঠোফোন নম্বরটি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু নামজারি ফাইলে ওয়ারিশ সনদ-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে তাঁর বড় ভাই অমরকে ভূমি অফিসে আটকে রাখেন এসি ল্যান্ড। পরে তাঁকে ইউএনওর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। বিষয়টি তাঁর বড় ভাইয়ের মোবাইল থেকে জানতে পেরে তিনি দোকান কর্মচারী শ্যামল কান্তি শর্মাকে নিয়ে উপজেলায় ছুটে যান। উপজেলা জামে মসজিদের সামনে যাওয়ার পর কথিত সাংবাদিক পরিচয়ে কিছু দুর্বৃত্ত তাঁর কর্মচারীর ওপর চড়াও হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, অভিযোগের বিষয়টির সঙ্গে মবের শিকার হওয়া সোনার দোকান কর্মচারীর কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। তাঁর ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনাটি দুঃখজনক বলে জানিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, প্রথমে তিনি বিষয়টি বুঝতে না পেরে সোনার দোকানের ওই কর্মচারীকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলেন। পরে সিসিটিভি ফুটেজে মবের বিষয়টি নিশ্চিতের পর তাঁকে ছেড়ে দিতে ওসিকে নির্দেশ দেন। সাংবাদিক পরিচয়দানকারী কয়েক ব্যক্তি বিষয়টি ভুলভাবে উপস্থাপন করে সোনার দোকানের ওই কর্মচারীকে ফাঁসিয়েছেন বলেও জানান তিনি।