চট্টগ্রামের আনোয়ারায় পারকি সমুদ্রসৈকত-সংলগ্ন কর্ণফুলী নদী থেকে ড্রেজার ও বুস্টার মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, এভাবে বালু তোলায় পারকি সৈকত, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ ও ৫০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল সার্ভিস এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। উপজেলা প্রশাসন বলছে, সৈকতসংলগ্ন নদী থেকে বালু উত্তোলনের কোনো অনুমোদন নেই।
আজ সোমবার দুপুরে সরেজমিনে পারকি সমুদ্রসৈকতের কর্ণফুলী টানেল সার্ভিস এলাকার কাছে সাগরে দুটি বাল্কহেড ও একটি ড্রেজার দেখা যায়। উপকূলে বসানো ছিল দুটি বুস্টার মেশিন। পাইপলাইনের মাধ্যমে বালু নিয়ে নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি ভরাট করা হচ্ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গত ১২ দিন ধরে এভাবে কর্ণফুলী নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, বালু উত্তোলনের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও উপকূলীয় ভারসাম্য ব্যাহত হতে পারে। বর্ষা বা ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
গত শনিবার ও আজ বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, পারকি সমুদ্রসৈকত-সংলগ্ন কর্ণফুলী নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু তোলা হচ্ছে। ঝাউবাগানের ভেতর দিয়ে পাইপলাইন বসিয়ে বালু কর্ণফুলী টানেল সার্ভিস এলাকার কাছে নেওয়া হচ্ছে। সেখানে বাল্কহেডে জমা করে প্রায় এক কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি ভরাটে ব্যবহার করা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার প্রিমিয়ার কোম্পানি নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্থানীয় বারশত ইউনিয়নের রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি ভরাটের কাজ করছে। কাজের তদারকিতে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির সুপারভাইজার মো. সাইফুল ইসলামসহ ১০ থেকে ১৫ জন কর্মী।
উপকূলীয় এলাকা রক্ষায় ১৯৯৩-৯৪ ও ২০০২ সালে পর্যায়ক্রমে পারকি ও এর আশপাশের প্রায় ৮০ হেক্টর এলাকায় ঝাউগাছ লাগায় বন বিভাগ। পরে গাছগুলো বড় হয়ে উঠলে এলাকাটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এলাকাটি ঝাউবাগান নামেও পরিচিত।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সৈকতে ঘুরতে আসা কয়েকজন পর্যটক বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি ভরাটের জন্য পারকি থেকে যেভাবে বালু তোলা হচ্ছে, তাতে রক্ষাকবচ পারকি সৈকত ও কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ৫০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল সার্ভিস এলাকাও হুমকিতে রয়েছে। তাঁরা স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানান।
সরেজমিনে দেখা যায়, সৈকত ভেদ করে আসা ড্রেজারের পাইপলাইন দিয়ে বালুর সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির মাছও উঠে আসছে। স্থানীয় কয়েকজনকে জাল ও হাত দিয়ে মাছগুলো সংগ্রহ করতে দেখা যায়।
পারকি এলাকায় ঝাউগাছের পাশে স্থাপিত একটি হলুদ রঙের সাইনবোর্ডে তিনটি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার নাম এবং লোগো দেখা গেছে। সেগুলো হলো পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক ও চায়না ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন।
সরেজমিনে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রতিনিধিকে পাওয়া যায়নি। ফলে প্রকল্পে তাদের সংশ্লিষ্টতা ও বালু উত্তোলনের বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
পারকি এলাকার বাসিন্দা হাবিব, হাসান ও আজগর বলেন, পারকি সৈকত-সংলগ্ন নদী থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের আপত্তি ছিল। শুরুতে এলাকার লোকজন বাধা দিয়েছিলেন। পুলিশও ঘটনাস্থলে এসেছিল। কিন্তু এখন আর কেউ বাধা দিচ্ছে না। এত বড় প্রকল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এর দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করারও কেউ নেই।
তাঁদের অভিযোগ, বালু উত্তোলনের কাজ করছে প্রিমিয়ার কোম্পানি, কিন্তু প্রকল্পস্থলের সাইনবোর্ডে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির নাম নেই। বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে বলে দাবি করেন তাঁরা।
প্রিমিয়ার প্রতিষ্ঠানের সুপারভাইজার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা শুধু ভরাট কাজের জন্য নিয়োজিত। প্রকল্পকাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান চুক্তিভিত্তিতে বাল্কহেড, ড্রেজার ও দুটি বুস্টার মেশিন আমাদের কোম্পানি থেকে ভাড়ায় নিয়েছে। তবে বালু কোথা থেকে নেওয়া হচ্ছে বা অনুমতি আছে কি না, আমরা কিছুই জানি না।’
প্রিমিয়ারের প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ‘আমরা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে কর্ণফুলী নদীর নির্দিষ্ট স্থান থেকে বালু উত্তোলন করে বাল্কহেড থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রে খালাস করছি।’ সাগরে অবস্থান করা বাল্কহেড ও ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন সম্ভব নয় বলেও দাবি করেন তিনি।
আনোয়ারা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবু জাফর মজুমদার বলেন, পারকি সৈকতসংলগ্ন নদী থেকে বালু উত্তোলনের কোনো অনুমোদন নেই। কারা বালু উত্তোলন করছে, খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।