হোম > সারা দেশ > চাঁপাইনবাবগঞ্জ

শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদের শ্রমের ফসলই এক স্কুলের ৫২ জনের বৃত্তি প্রাপ্তি

আব্দুল বাশির, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

নবাবগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নবাবগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গতানুগতিক গাইড বই ও প্রাইভেট কোচিংয়ে না ঢুকে বরং পাঠ্যবইকে আশ্রয় করেই শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় মনোযোগী করার চেষ্টা করা হয়েছে এখানে। এ জন্য শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও শ্রম দিতে হয়েছে সমানভাবে। আর সব কিছুর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার নেপথ্যের কারিগর যিনি, তিনি বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক লতিফা হক। তাই তাঁরই হাত ধরে এবার প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় বিশাল রেকর্ড গড়েছে এ স্কুলের শিক্ষার্থীরা।

পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এই স্কুলের ৫৩ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫২ জনই বৃত্তি লাভ করায় পুরো দেশের কাছে স্কুলটি আজ নতুনভাবে পরিচিতি পাচ্ছে।

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, পরিকল্পিত পাঠদান, নিয়মিত মূল্যায়ন, শিক্ষক-অভিভাবক সমন্বয় ও শিক্ষার্থীদের কঠোর পরিশ্রম এই অর্জনের ভিত্তি।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি শিক্ষাবর্ষে পঞ্চম শ্রেণিতে মোট শিক্ষার্থী ছিল ১৪৫ জন। প্রথম সাময়িক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি পরীক্ষার জন্য বাছাই করা হয়। পরে নির্বাচিত ৫৩ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৫২ জন বৃত্তি অর্জন করে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লতিফা হক বলেন, ৫৩ জন শিক্ষার্থীর প্রায় সবাই বৃত্তি পাওয়ার মতো মেধাবী ছিল। এই সাফল্যের পেছনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা রয়েছে।

পাঠদান পদ্ধতি সম্পর্কে লতিফা হক জানান, বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের জন্য আলাদা শাখা খোলা হয়েছিল। সেখানে নিয়মিত পাঠ্যসূচির পাশাপাশি বৃত্তির সিলেবাসও পড়ানো হতো। প্রতি সপ্তাহে মডেল টেস্ট নেওয়া ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভুল চিহ্নিত করে তা সংশোধনের ব্যবস্থা করা হতো।

লতিফা হক আরও বলেন, নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি, শিক্ষকদের প্রত্যাশা ও অভিভাবকদের করণীয় বিষয়ে আলোচনা করা হতো। কোনো শিক্ষার্থী যেন কারণ ছাড়া শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিত না থাকে, সেটিও শিক্ষকেরা নিশ্চিত করেছেন।

একজন শিক্ষার্থী বৃত্তি না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘ওই শিক্ষার্থীও অত্যন্ত মেধাবী। শ্রেণিতে তার অবস্থান সব সময় প্রথম দশজনের মধ্যে ছিল। আমাদের বিশ্বাস, খাতা পুনর্মূল্যায়নের পর সে-ও বৃত্তি পাবে। তাই আমরা খাতা পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।'

ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থী নুসরাত খানম বলে, ‘ভালো ফলের জন্য খুব বেশি পড়তে হয়েছে, তেমনটি না। প্রতিদিন রাত ১০টার মধ্যে লেখাপড়া শেষ করতাম আর ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠে আবার পড়তে বসতাম। সকালে পড়া তাড়াতাড়ি আয়ত্ত করতে পারতাম এবং মনে থাকত বেশি। বাবা-মা আমাদের খুব সহযোগিতা করেছে। এ ছাড়া শিক্ষকেরা ক্লাসের পড়া ক্লাসেই নিতেন। আর বৃত্তির জন্য নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের আলাদা বিশেষ প্রস্তুতিমূলক ক্লাস নিতেন। সেখানে আমরা নিজেদের বৃত্তি পাওয়ার জন্য উপযুক্ত করে নিতে পেরেছি।’

বৃত্তিপ্রাপ্ত এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক শামসুল আলম বলেন, ‘বিদ্যালয়টির লেখাপড়ার মান অত্যন্ত ভালো। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই এই সাফল্য এসেছে।’

শামসুল আলম বিদ্যালয়ের কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ১৭ জন। পাশাপাশি রয়েছে শ্রেণিকক্ষের সংকট। পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষকদের দাপ্তরিক কাজের চাপও সামলাতে হয়। এসব বিষয়ে সরকারের নজর বাড়লে বিদ্যালয়টি আরও ভালো ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম হবে বলে তিনি মনে করেন।

অভিভাবকেরা বলেন, শিক্ষকেরা যদি প্রাইভেট পড়ানোর কথা না ভেবে ক্লাসে মনোযোগী হন, পাঠদানকে আনন্দময় করে তোলেন, তবে শিক্ষার্থীরা অবশ্যই পড়াশোনা করবে এবং ভালো ফলাফল করবে, এটাই স্বাভাবিক।

বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক মরিয়ম নেসা বলেন, ‘শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সমন্বিত প্রচেষ্টার কারণেই এই ফলাফল সম্ভব হয়েছে। আমাদের শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে আসার নির্দিষ্ট সময় আছে, কিন্তু বাড়ি ফেরার নির্দিষ্ট সময় নেই। শিক্ষার্থীদের উন্নতির জন্য আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত সময় দিই। আর এর ফলাফলও আমরা হাতেনাতেই পেয়েছি। শিক্ষার্থীদের এই সাফল্যই আমাদের সাফল্য, আমাদের প্রাপ্তি।’

মরিয়ম নেসা জানান, বিদ্যালয়ে নিয়মিত ব্যক্তিগত প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং প্রতিটি মডেল টেস্টের ফল শ্রেণিকক্ষেই বিশ্লেষণ করা হয়। কোনো শিক্ষার্থী কোনো বিষয়ে দুর্বল হলে তাকে সহপাঠীদের সহযোগিতায় বিষয়টি আয়ত্ত করার সুযোগ দেওয়া হয়।

মরিয়ম নেসা বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ে শুধু মূল পাঠ্যবই অনুসরণ করে পাঠদান করা হয়। কোনো ধরনের গাইড বই পড়ানো হয় না। ফলে বইয়ের যেকোনো অংশ থেকে প্রশ্ন করা হলেও শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দিতে পারে।'

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, নবাবগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই সাফল্যের পেছনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অভিভাবকদের সচেতনতা, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের বিশেষ নজরদারি, শিক্ষার্থীদের আন্তরিকতা ও উদ্যম—সব মিলিয়েই এই অর্জন সম্ভব হয়েছে।

সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, এই বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা প্রথম শ্রেণি থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল। তাঁরা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে পাঠদান করেন। শিক্ষকদের এই নিবেদন ও শ্রমের কারণেই শিক্ষার্থীরা এত ভালো ফলাফল করতে পেরেছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘বিদ্যালয়টিতে শতাধিক মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছে। বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হওয়ায় সবাই অংশ নিতে পারেনি। আমার বিশ্বাস, সুযোগ পেলে তাদের অনেকেই বৃত্তি অর্জন করতে সক্ষম হতো।’

এর আগেও বৃত্তি পরীক্ষায় সাফল্যের নজির রয়েছে বিদ্যালয়টিতে। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটির ৩৯ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৩৭ জন বৃত্তি অর্জন করেছিল। তাদের মধ্যে ৩২ জন ট্যালেন্টপুল ও পাঁচজন সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পেয়েছিল।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফলাফলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পাঁচ উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেনের মোট ৯৬৩ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে। এর মধ্যে ৪২০ জন ট্যালেন্টপুল ও ৫৪৩ জন সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি অর্জন করেছে।

ফলাফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই এগিয়ে রয়েছে। মোট বৃত্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে ৭৬৩ জন সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ৩৪০ জন ট্যালেন্টপুল ও ৪২৩ জন সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পেয়েছে। অন্যদিকে জেলার বিভিন্ন কিন্ডারগার্টেনের ২০০ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি অর্জন করেছে।

উল্লেখ্য, গত ১৫ এপ্রিল জেলার ১২টি কেন্দ্রে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষায় নিবন্ধিত ৮ হাজার ২৪৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫ হাজার ৮৩৮ জন অংশ নেয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী, ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা মাসিক ৬০০ টাকা এবং সাধারণ গ্রেডে বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা মাসিক ৪৫০ টাকা হারে সরকারি বৃত্তি ও বিশেষ মেধা সনদ পাবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে তহশিলদারের ঘুষ নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল, তদন্ত শুরু

পুশ ইন করা চার নাগরিককে ফেরত নিল ভারত

ভোলাহাটে মোটরসাইকেল-বাইসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ, বৃদ্ধ নিহত

পানিতে ডুবে মৃত্যু: ডুবুরি-সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নেই

চকপাড়া সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাল বিজিবি ও স্থানীয়রা

সাংবাদিক দেখে দৌড়ে পালালেন চিকিৎসক

পদ্মায় দুই ছাত্রের মরদেহ উদ্ধার, মহানন্দায় নিখোঁজ যুবক

স্কুল ছুটির পর পদ্মায় গোসল করতে নেমে নিখোঁজ দুই ছাত্র

পরীক্ষার মধ্যে কলেজ মাঠে ম্যাঙ্গো ফেস্টে দিনভর বাজল সাউন্ড বক্স, পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তি

মাদকসংক্রান্ত বিরোধে বন্ধুর ছুরিকাঘাতে যুবক নিহত