বগুড়ার গাবতলীতে একটি কলেজের পরিচালনা কমিটি ও প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়ে বিরোধের জেরে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এক পক্ষের আয়োজিত মানববন্ধনে অপর পক্ষের বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কি হয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে সড়কে অবস্থান নেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার সোনারায় ইউনিয়ন পরিষদের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোনারায় ইউনিয়নের তছলিম উদ্দিন তরফদার ডিগ্রি কলেজ থেকে এবার ৪৫ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলেও কেউ উত্তীর্ণ হতে পারেননি। ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই কলেজটির পরিচালনা কমিটি, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ এবং শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ে উত্তেজনা শুরু হয়।
এরই মধ্যে সোনারায় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সদস্য রাজা মণ্ডলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে আজ মঙ্গলবার সকালে মানববন্ধনের আয়োজন করেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হেলালুজ্জামান তালুকদার লালুর অনুসারীরা।
মানববন্ধনে বক্তারা বক্তব্য দেওয়া শুরু করলে বর্তমান সংসদ সদস্য মোরশেদ মিল্টনের অনুসারীরা সেখানে গিয়ে ব্যানার ও ফেস্টুন কেড়ে নেন বলে অভিযোগ করেন আয়োজকেরা। এ নিয়ে প্রথমে দুই পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। পরে তা ধাক্কাধাক্কি ও হট্টগোলে রূপ নেয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে সড়কে অবস্থান নেন। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে সংসদ সদস্য মোরশেদ মিল্টনের অনুসারীরা মানববন্ধনের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ করেন।
কলেজের শিক্ষক ও অভিভাবকদের একাংশের অভিযোগ, পরিচালনা কমিটি নিয়ে বিরোধ এবং শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের কারণে কলেজটির শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। তাঁদের দাবি, নিয়মিত পাঠদান না করে অনেক শিক্ষক দলাদলি ও রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। কেউ কেউ নামমাত্র হাজিরা দিয়ে বাজারে আড্ডা দেন। এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গেলে অভিভাবকদের হয়রানি ও লাঞ্ছিত করা হয়।
কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, পূর্ণাঙ্গ অধ্যক্ষ নিয়োগ ও পরিচালনা কমিটির বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে আমাকে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এতে সম্মত না হওয়ায় আমাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, নিয়োগ-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মের সময় তাঁকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট পরিবারের একজনকে অবৈধভাবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ অধ্যক্ষ থাকা অবস্থায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগের সুযোগ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
মানববন্ধনে বক্তারা সোনারায় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রাজা মণ্ডলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও তোলেন। তাঁদের দাবি, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বিভিন্ন সেবা নিতে গেলে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। বিশেষ করে বিভিন্ন সনদ ও নিবন্ধন নিতে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।
মানববন্ধনে সোনারায় ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আব্দুল হালিম বলেন, নির্বাচনী প্রচারে মানুষের দ্বারে দ্বারে গেলে ইউনিয়ন পরিষদের সেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের নানা অভিযোগ শুনতে হয়। বিভিন্ন সনদ ও নিবন্ধন নিতে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ছাড়া স্থানীয় বিএনপির অনেক নেতা কর্মী সংসদ সদস্যের কাছ থেকে যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছেন না বলেও দাবি করেন আব্দুল হালিম।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সোনারায় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রাজা মণ্ডল জানান, কলেজের ৪৭ জন পরীক্ষার্থীর কেউ পাস না করায় অভিভাবক ও সচেতন নাগরিক হিসেবে তাঁরা মানববন্ধন করেছিলেন। পরে কলেজের গভর্নিং বডির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। ওই সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাতেই তাঁরা এদিন অবস্থান নিয়েছেন।
ইউনিয়ন পরিষদের সেবার বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে রাজা মণ্ডল বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। পরিষদে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও হিসাব সহকারী রয়েছেন। তাঁদের কাছে খোঁজ নিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ বা সংশ্লিষ্টতা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে গাবতলী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিব হাসান বলেন, এক পক্ষ মানববন্ধন করতে গেলে অপর পক্ষ বাধা দেয়। এ নিয়ে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।