বরিশাল নগরের কালীবাড়ি রোডের আলোচিত সূর্যমুখী হেয়ার ড্রেসারের জৌলুশ যেন ফিকে হয়ে গেছে। দুই বছর আগেও এই সেলুনের নরসুন্দর উমেশের কাটতি ছিল বেশ। কারণ, এখানে চুল কাটানোর জন্য আসতেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নগর সম্পাদক ও সাবেক সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। তিনি এখানে লাইভে এসে বারবার উমেশের নাম বলতেন।
উমেশের সেলুনের ঠিক ২৫ থেকে ৩০ গজ দূরে কালীবাড়ি রোডে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর পৈতৃক বাড়ি। এই সেলুনের মতো গুঁড়িয়ে দেওয়া হাসানাতের ভাঙাচোরা বাড়িটিও এখন খাঁ খাঁ করছে। ভবনের নিচে যেন চাপা পড়ে আছে সেরনিয়াবাত পরিবারের দম্ভ, অহংকার আর ক্ষমতার মসনদ।
সরেজমিনে গত সোম ও মঙ্গলবার দেখা গেছে, কালীবাড়ি রোডে হাসানাতের বাড়ির সামনে টিনের বেড়া দেওয়া। ভেতরে বড় বড় ঘাস। বেড়ার পাশে কিছু টাইলস ফেলে রাখা। পাশের উদয়ন ক্লাব ও ব্যায়ামাগার শহীদ স্মৃতি পাঠাগার তালাবদ্ধ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের দিন ছাত্র-জনতা বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেয়। এখন সেই বাড়ি, পাঠাগার এবং আশপাশের দোকানপাট ঘিরে আগের সেই মানুষের ঢল আর নেই। সেই কালীবাড়ি রোড এখন যেন জনশূন্য।
কথা হয় হাসানাতের বাড়ির পাশের একটি রেস্টুরেন্টে খেতে আসা ক্রেতাদের সঙ্গে। সেখানে পটোল ভাজা খেতে আসা স্থানীয় জসিম ও ফারুক জানান, এই দোকানে পটোল ভাজা খেতে দীর্ঘ সারি দিতে হতো। কারণ, তৎকালীন পাগলাটে মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ সারা রাত এই সেরনিয়াবাত ভবনেই অফিস করতেন আর অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমাতেন। বরিশালে বাপ-বেটার এত ক্ষমতা যে নিমেষে শেষ হয়ে যাবে, কেউ কল্পনাও করেনি।
নরসুন্দর উমেশ বলেন, ‘লোকজন বলে যে উমেশ, তোমার কথা বলতেন সাদিক আবদুল্লাহ। তাঁর সঙ্গে কথা হয়?’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের সকল লেনদেন, ফাইল চালাচালি এ ভবনেই চলতে। নগর ভবন ছিল অচল। দূরদূরান্ত থেকে আসা ভুক্তভোগী রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, অধ্যক্ষ, প্রশাসনের বড় কর্তারা তদবিরে এসে রাত ১টা কিংবা ২টার আগে সাদিকের সঙ্গে দেখা করতে পারতেন না।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) দায়িত্বশীল দুই কর্মকর্তা জানান, সেরনিয়াবাত ভবনে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে লাঞ্ছিত ও মারধরের শিকার হতে হয়েছে সাদিকের হাতে। সব সময় তাঁর সঙ্গে থাকত ৬ খলিফা।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগেই ২০২৪ সালের জুনে ভারতের আজমির শরিফে যান বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। এ কারণে জুলাই আন্দোলনের আঁচ তাঁর গায়ে লাগেনি।
মহানগর আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কালীবাড়ি রোডের সেরনিয়াবাত ভবনে হাসানাতপুত্র সাদিক আবদুল্লাহ বসবাস করতেন। ৫ আগস্ট বেলা সাড়ে ৩টার দিকে সেরনিয়াবাত ভবনের সামনে ছাত্র-জনতা জড়ো হয়। শত শত মানুষ হামলার একপর্যায়ে আগুন দেয় ওই ভবনে। হামলার সময় সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ ওই বাসায় ছিলেন। বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে পৌনে ৫টার দিকে সেরনিয়াবাত ভবনের পেছন দিক দিয়ে পরিবারসহ পালিয়ে যান তিনি। পরে ওই বাড়ি থেকে আওয়ামী লীগ নেতা গাজী নইমুল হোসেন লিটু, যুবলীগ নেতা মঈন, নুরুর দগ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। বর্তমানে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ভারতে এবং তাঁর ছেলে সাদিক আবদুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন বলে একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।