বান্দরবানের সাত উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা এখন গভীর সংকটের মুখে। জেলার ৪৩৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৭৪টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় শিক্ষা কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের প্রশাসনিক দায়িত্বের চাপ বাড়ায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে সময় কমে যাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের শেখার ওপর। ফলে শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, সদর উপজেলায় ৭৬টির মধ্যে ৬টি, রুমায় ৬৮টির মধ্যে ৪৩টি, রোয়াংছড়িতে ৬২টির মধ্যে ২৭টি, থানচিতে ৩৮টির মধ্যে ২৮টি, লামায় ৮৫টির মধ্যে ১৯টি, নাইক্ষ্যংছড়িতে ৫৬টির মধ্যে ২২টি এবং আলীকদমে ৫০টির মধ্যে ২৯টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। জেলায় সবচেয়ে বেশি প্রধান শিক্ষক কর্মরত আছেন সদর ও লামা উপজেলায়। সবচেয়ে কম প্রধান শিক্ষক রুমা ও থানচি উপজেলায়।
নাইক্ষ্যংছড়ি মিরঝিড়ি পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আপেল বড়ুয়া বলেন, ‘৫২ জন ছাত্রছাত্রী, সহকারী শিক্ষকসহ আমরা ৩ জন কর্মরত আছি। প্রধান শিক্ষক না থাকায় প্রশাসনিক কাজ করে শ্রেণিতে পাঠদান কঠিন হয়ে যায়।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে পাঠদানের পাশাপাশি প্রতিদিন অফিস পরিচালনা, হিসাবরক্ষণ, সরকারি প্রতিবেদন তৈরি এবং নানা প্রশাসনিক ফাইলে স্বাক্ষর করতে হয়। ফলে ক্লাসে গিয়ে নিয়মিত পড়ানোর সুযোগ থাকে না। শিক্ষকসংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে বাধ্য হয়ে একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে বসিয়ে ক্লাস নিচ্ছে। এতে শিশুদের পড়াশোনার ভীষণ ক্ষতি হচ্ছে।
লামার আন্ধারি জামালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শহীদুল্লাহ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দুই বছর ধরে দায়িত্বে আছি। প্রধান শিক্ষক না থাকায় শ্রেণি কার্যক্রম ব্যাহত হয়। অফিশিয়াল কাজও ঠিকভাবে করা যায় না।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলায় সহকারী শিক্ষকের ২ হাজার ৫৪টি পদের মধ্যে ৫৩টি পদ শূন্য রয়েছে। তিন প্রধান শিক্ষকের হাইকোর্টে মামলা ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের আপত্তির কারণে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ স্থগিতসহ প্রাথমিকের সব ধরনের শিক্ষক নিয়োগ ও বদলি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এ কারণে জেলার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় স্থবিরতা বিরাজ করছে।
রুমার মেনতক পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মংখ্যাই অং মার্মা বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক না থাকার কারণে সহকারী শিক্ষকেরা অনেক সময় স্কুলে আসতে চান না। প্রশাসনিক কাজে স্থবিরতা বিরাজ করে, ফলে পাঠদানও ব্যাহত হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার দুর্গম এলাকার শিশুদের শিক্ষার আলো ছড়ানোর জন্য যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তাদের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগ আমলে জেলা সদরের বিদ্যালয়গুলোতে চলে আসেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রধান শিক্ষকদের বদলি করা হলেও পরে তা স্থগিত করা হয়। আর যাঁরা উপজেলার দুর্গম এলাকায় কর্মরত আছেন, তাঁরা ভাড়াটে শিক্ষক নিয়োগ করে ক্লাসে পাঠদান এবং মাসে একবার গিয়ে বেতন উত্তোলন করে চলে আসেন।
এই বিষয়ে বান্দরবানের ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পরিণয় চাকমা বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে হাইকোর্টে মামলা চলছে, মামলা নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগ, বদলি সব বন্ধ। এর ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় প্রভাব পড়ছে।’