বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও পূর্ণিমার জোয়ারের প্রভাবে প্রবল বৃষ্টিতে বাগেরহাটের ১৭ হাজারের বেশি মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে চাষিদের প্রায় ১১ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। গত মঙ্গলবার সকাল থেকে টানা বর্ষণে পানি বৃদ্ধির ফলে এই ক্ষতি হয়েছে। মৎস্য বিভাগ ও চাষিরা বলছেন, বৃষ্টি ও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত ঘেরের সংখ্যা ও ক্ষতির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে দেখা যায়, গত দুই দিনের অবিরাম বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে বাগেরহাটের সদর, কচুয়া, রামপাল, মোংলা, মোরেলগঞ্জ, ফকিরহাট, শরণখোলা উপজেলার কয়েক হাজার চিংড়িঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাগেরহাট মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন উপজেলার ১৭ হাজার ৩৭৫টি মাছের ঘের ও পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৭ হাজার ৪৩৪টি পুকুর, ৯ হাজার ৬৬৪টি ঘের এবং ২৭৫টি কাঁকড়া-কুচিয়ার খামার রয়েছে। ফলে চাষিদের ২ কোটি ৫১ লাখ টাকার সাদা মাছ, ৭ কোটি ১৫ লাখ টাকার চিংড়ি এবং ২৪ লাখ টাকার কাঁকড়া-কুচিয়া ভেসে গেছে। অবকাঠামোরও ক্ষতি হয়েছে ৫৭ লাখ টাকার। সব মিলিয়ে টাকার অঙ্কে চাষিদের ১০ কোটি ৯৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি বলে দাবি চিংড়িচাষিদের।
বাগেরহাট সদর উপজেলার বেমরতা এলাকার চাষি হাকিম বলেন, বৃষ্টিতে এলাকার অনেকের ঘের ডুবে গেছে। তাঁর ৬ বিঘার ঘের ডুবেছে। প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাঁদের এই অবস্থা হয়।
মোংলা উপজেলার চিংড়িচাষি মিলন কাজি বলেন, রাতের বৃষ্টিতে ঘেরের পাড় দুর্বল হয়ে যায়। সকালের জোয়ার এবং বৃষ্টির পানিতে তাঁর ঘেরের পাড়ের কয়েক জায়গা ভেঙে পানি ঢোকে। এতে তাঁর কয়েক লাখ টাকার বাগদা চিংড়ি বের হয়ে গেছে।
মোরেলগঞ্জ উপজেলার বহরবুনিয়ার আজিজুল ইসলাম বলেন, চাষাবাদের ওপর নির্ভর করেই তাঁদের এলাকার বেশির ভাগ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন। টানা বৃষ্টিতে এলাকার বেশির ভাগ পুকুর-ঘের ভেসে গেছে। ইয়াসের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতে তাঁরা আবার ক্ষতির মুখে পড়লেন।
বাগেরহাট জেলা চিংড়িচাষি সমিতির সভাপতি ফকির মহিতুল ইসলাম সুমন বলেন, একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে চিংড়িচাষিরা ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি হারিয়ে ফেলছেন। এখন পর্যন্ত জেলায় অন্তত ২০ হাজারের বেশি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে প্রায় ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। চিংড়িচাষিদের টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের সার্বিক সহযোগিতার বিকল্প নেই।
বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম রাসেল বলেন, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত বাগেরহাটের বিভিন্ন উপজেলায় ১৭ হাজারের বেশি মাছের ঘের ও পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ১১ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে জেলার অর্ধলক্ষাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বাগেরহাট সদর উপজেলার খানজাহান পল্লি গোবরদিয়া, কাড়াপাড়া, নাগেরবাজার, শাহপাড়া, হাঁড়িখালি-মাঝিডাঙ্গা আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ বাগেরহাট শহরের বেশ কয়েটি সড়কের ওপর এক থেকে দেড় ফুট পানি দেখা যায়। বৃষ্টির পানিতেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উপযুক্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বাগেরহাট শহরের এই অবস্থা বলে দাবি করেছেন অনেকে।
অন্যদিকে শরণখোলার খুড়িয়াখালী, সাউথখালি, কচুয়ার নরেন্দ্রপুর, চন্দ্রপাড়া, রাড়িপাড়া, পদ্মনগর, ভাণ্ডারখোলা, মোরেলগঞ্জ পৌরসভা এলাকা, শানকিভাঙ্গা, চিংড়াখালীসহ অসংখ্য এলাকা এখন পানিতে নিমজ্জিত। এসব এলাকার মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন। না পারছেন বাইরে যেতে, না পারছেন রান্না করে খেতে।
রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কবির হোসেন বলেন, গত বুধবার বিকেলে বৃষ্টির মধ্যে আকস্মিক ঝড় হয়। এতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার দশটি কাঁচা ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্ধশতাধিক গাছ উপড়ে পড়েছে।
বাগেরহাট সদর উপজেলার চুলকাঠি এলাকার সাইদুল মীর বলেন, বৃষ্টিতে ঘেরের পাড় এবং ভিটায় সব জায়গায় পানি উঠে গেছে। শসা, ঢ্যাঁড়স, পেঁপে, লাউসহ সব ধরনের গাছের গোড়ায় পানি রয়েছে। এভাবে দুই এক দিন থাকলে সব শিরা পচে যাবে। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে, রোদ উঠলেই এসব গাছ মারা যাবে।
শরণখোলা উপজেলার ভোলা নদীর চরের অবস্থিত গুচ্ছগ্রামের মালেক, খলিক, কুদ্দুস, সাইদুল শিকদারসহ কয়েকজন বলেন, মঙ্গলবার রাত থেকেই পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছেন। রান্না বন্ধ। দুই দিন ধরে শুকনো খাবার খেয়েই আছেন। পানি না নামলে না খেয়ে মরতে হবে।
একই উপজেলার সাউথখালি এলাকার শহিদুল ইসলাম বলেন, আম্ফান ঘূর্ণিঝড়কে হার মানিয়েছে এই বৃষ্টি। এত বেশি পানিবন্দী মানুষ একসঙ্গে কখনো দেখেননি তিনি।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, টানা বৃষ্টিতে শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, মোংলা, রামপাল, বাগেরহাট সদর ও কচুয়ার বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে অর্ধলক্ষ পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পানিবন্দী পরিবারগুলোর মধ্যে শুকনো খাবার ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ শুরু করেছেন। তাঁদের সব ধরনের সহযোগিতা করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।