ধান চাষ করে এখন আর তেমন লাভের মুখ দেখছেন না কৃষক। বীজ, সার ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি, সেচের জন্য জ্বালানি তেলের হাহাকার ও অধিক মূল্যে তেল সংগ্রহ এবং সবশেষে ধান কেটে ঘরে তুলতে শ্রমিকদের অতিরিক্ত মজুরি—সব মিলিয়ে একেবারে জেরবার অবস্থা ধানচাষিদের। এবারও তার ব্যতিক্রম নেই।
ধান কাটা মৌসুমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ কিষানের (শ্রমিক) হাট বসেছে বাগেরহাটের ফকিরহাট বাজারে। প্রায় অর্ধশত বছরের পুরোনো এ কিষানের হাটেও হঠাৎ বেড়েছে মজুরি। জনপ্রতি দৈনিক ১ হাজার ৩০০ টাকা বেতন ও তিনবেলা খাবার না হলে মিলছে না শ্রমিক। অপর দিকে প্রতি মণ ধানের মূল্য ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা। ফলে গড়ে জনপ্রতি কিষানের দৈনিক মজুরি দেড় থেকে দুই মণ ধানের দামের সমান। এতে বিপাকে পড়েছে বোরো ধানচাষিরা।
গত রোববার (২৬ এপ্রিল) ফকিরহাট কিষানের হাটে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকদের সঙ্গে শ্রমিকেরা মজুরি নিয়ে দর-কষাকষি করছেন। জনপ্রতি গড়ে ১ হাজার ৩০০ টাকা মজুরি দিয়ে শ্রমিক নিতে হচ্ছে চাষিদের।
জানা গেছে, উপজেলা কৃষি বিভাগ বৃষ্টির আশঙ্কায় চাষিদের আগাম ধান কাটার পরামর্শ দিয়েছেন। এতে হঠাৎ কিষানের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকেরা অন্য সময়ের তুলনায় বেশি মজুরি হাঁকিয়েছেন। এ ছাড়া প্রচণ্ড গরম ও রোদের খরতাপে শ্রমিকেরা পাঁচ-ছয় ঘণ্টার বেশি কাজ করতে পারছেন না। ফলে এত টাকা দৈনিক মজুরি দিয়ে আসলে পোষায় না কৃষকের। সব মিলে ধান চাষ আর লাভজনক থাকছে না চাষির জন্য। এ অবস্থায় অনেকেই গম, ভুট্টাসহ সবজি চাষের দিকে ঝুঁকছেন, যা দেশে খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করবে।
প্রতিবছরই এই মৌসুমে ফকিরহাটে শ্রমিকের চাহিদা বেশি থাকায় যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইল, বগুড়া, পিরোজপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিক এসে এখানে কাজ করে থাকেন। আর এসব শ্রমিককে বাজার থেকে নিয়ে আসা থেকে শুরু করে সব খরচ কৃষককেই বহন করতে হয়। ফলে খরচের পাল্লা বাড়তেই থাকে তাঁদের।
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলা থেকে কাজে আসা হায়দার আলী জানান, তাঁদের দলে ৯ জন লোক আছেন, জনপ্রতি ১ হাজার ৩০০ টাকা মজুরি ও তিনবেলা খাবার চুক্তিতে মোল্লাহাটের এক মহাজন তাঁদের কাজের জন্য নিয়ে যাচ্ছেন।
উপজেলার নোয়াপাড়া এলাকা থেকে শ্রমিক কিনতে আসা চাষি সেলিম শেখ, ছোট হুসলা থেকে আসা মোস্তফা হাসানসহ কয়েকজন জানান, মজুরি বাড়ায় বর্গাচাষিরা পড়েছেন মহা বিপাকে। ১ হাজার ৩০০ টাকা মজুরি ছাড়াও তিনবেলা খাবার ও পানা-বিড়ি বাবদ অতিরিক্ত ২০০ টাকা ব্যয় হয়। এ ছাড়া শ্রমিকদের বাজার থেকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পরিবহন খরচ রয়েছে। সব মিলিয়ে শ্রমিক প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়। অন্য দিকে চাষাবাদের খরচ এবং ফসল কাটার খরচ মিলিয়ে তাঁদের মতো বর্গাচাষিরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। সব খরচ মিটিয়ে ঘরে ফসল তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা।
কৃষকদের দাবি, এ পরিস্থিতিতে কৃষি বিভাগ থেকে যান্ত্রিকভাবে ধান কাটার ব্যবস্থা করা হোক। না হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে ধান ঘরে তোলা সম্ভব হবে না। ফলে আসন্ন বৃষ্টি বলয়ের প্রভাবে মাঠেই সব ধান নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া কোনো কোনো খেতে কারেন্ট পোকার আক্রমণ শুরু হয়েছে, যা বাড়তি চিন্তার কারণ।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ফকিরহাটে আট হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। ধানের ফলনও ভালো হয়েছে। এ বিশাল পরিমাণ ধান কাটার জন্য উপজেলায় মাত্র ৩০টি রিপার মেশিন আছে যা চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
ফকিরহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সেখ সাখাওয়াত হোসেন শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘বোরো আবাদের তুলনায় রিপার মেশিন অনেক কম রয়েছে। তারপরেও কোনো চাষি যদি রিপার মেশিনের সহায়তা চায়, তাহলে আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা করব। মাসের শেষ দিকে বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। তার আগেই ধান কাটার পরামর্শ দিয়েছি কৃষকদের।'