হোম > বিশ্লেষণ

ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের নেপথ্যে চার দশকের লালিত বাসনা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন ইরান আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন—এই প্রশ্নের উত্তর আপনি সপ্তাহের কোন দিন তাঁকে জিজ্ঞাসা করছেন, তার ওপর ভিত্তি করে বদলে যাবে। গত শনিবার তিনি বলেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর ব্যালিস্টিক মিসাইল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি। গত রোববার প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হলো, ইরানের প্রক্সিরা মার্কিন কর্মীদের জন্য ‘আসন্ন বিপদ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত সোমবার ট্রাম্পের মিত্ররা বললেন, ইরানের আসন্ন হামলা থেকে মার্কিন বাহিনীকে বাঁচাতে এটি একটি ‘প্রতিরোধমূলক’ পদক্ষেপ। আর গত মঙ্গলবার ট্রাম্প নিজেই সব যুক্তি খণ্ডন করে বললেন, ইরান হামলা করতে যাচ্ছিল বলেই তিনি আগেভাগে আঘাত হেনেছেন।

এসব অজুহাতের মধ্যেই ফাঁক রয়েছে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, যদি আট মাস আগের ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ’ করে থাকে, তবে আবার কেন এই হামলা? আর মার্কিন ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ) যেখানে বলছে, ইরানের মিসাইল যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে পৌঁছাতে আরও এক দশক সময় লাগবে, সেখানে ‘আসন্ন হুমকি’র দাবি কতটুকু যৌক্তিক?

আসলে এই যুদ্ধের প্রকৃত কারণ কোনো ‘আসন্ন হুমকি’ নয়, বরং ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘ ৪৬ বছরের ব্যক্তিগত অ্যাজেন্ডা।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিদ্বেষ নতুন কিছু নয়। ১৯৮০ সালে এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তরুণ ট্রাম্প ইরানি জিম্মি সংকট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—তিনি ইরানে সেনা পাঠানোর পক্ষপাতী কি না, তিনি সরাসরি বলেছিলেন, ‘আমি অবশ্যই তা মনে করি। আমরা যদি তখন তা করতাম, তবে আজ আমরা একটি তেলসমৃদ্ধ জাতি হতাম।’

১৯৮৭ সালে নিউ হ্যাম্পশায়ারে এক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘বুলিং’ করার প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের তেলক্ষেত্রগুলো দখল করে নেওয়া উচিত। ১৯৮৮ সালে দ্য গার্ডিয়ানকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ইরানের ওপর কঠোর হতাম। ওরা আমাদের মানসিকভাবে হারিয়ে দিচ্ছে, আমাদের বোকা বানাচ্ছে।’

অনেকে মনে করেছিলেন, ট্রাম্প হয়তো যুদ্ধবিরোধী একজন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। তিনি ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ ও ২০১১ সালের লিবিয়া হস্তক্ষেপে প্রাথমিকভাবে সমর্থন দিয়েছিলেন (যদিও পরে পরিস্থিতি খারাপ হলে ভোল পাল্টেছিলেন)। প্রথম মেয়াদে তিনি কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করেছিলেন। আর দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তোলা থেকে শুরু করে গ্রিনল্যান্ড দখল করতে চাওয়া বা ভেনেজুয়েলার একনায়ককে তুলে আনার মতো আক্রমণাত্মক নীতি নিয়েছেন।

সিএনএনের সাংবাদিক অ্যান্ড্রু কাচিনস্কির মতে, ট্রাম্প কোনো যুদ্ধবিরোধী নেতা নন; তিনি কেবল সেই যুদ্ধের বিরোধী, যা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

ইসরায়েল গত কয়েক বছরে ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ক ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে যেভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে, ট্রাম্প মূলত সেই সুযোগটিই নিয়েছেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে হত্যার জন্য সিআইএর গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করা থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরাক যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় বিমানবহর পাঠানো, সবই ছিল সুপরিকল্পিত।

ট্রাম্প যখন দেখলেন, ইরান এখন ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বলতম অবস্থানে আছে, তখনই তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের লালিত ‘ইরান জয়ের’ স্বপ্ন বাস্তবায়নে নেমে পড়েছেন।

যদিও এই যুদ্ধে ইসরায়েল বা সৌদি আরব লাভবান হতে পারে, কিন্তু যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত ছিল একান্তই ট্রাম্পের। তাঁর সহযোগীরা ‘আসন্ন হুমকি’ বা ‘নিরাপত্তা’র যত অজুহাতই খাঁড়া করুক না কেন, সত্য এটাই যে, এই যুদ্ধ ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার দশকের এক ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যবাদী দর্শনের চূড়ান্ত রূপ। এখন এই যুদ্ধের যে ভয়াবহ আঞ্চলিক পরিণাম তৈরি হতে যাচ্ছে, তার পুরো দায়ভারও তাঁকেই নিতে হবে।

স্থল অভিযান ছাড়া ইরানের শাসকদের উৎখাত সহজ নয়

যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবসে প্রতিশোধ নিতে পারে ইরান

ইরানের বিরোধী শক্তি কারা, তারা কি ক্ষমতা নিতে পারবে

যে কারণে ইরানকে বাঁচাতে আসছে না চীন

ট্রাম্পের আমেরিকা কি ইরাকের শিক্ষা ভুলে গেছে

ইরান সংকট হতে পারে মার্কিন সাম্রাজ্য পতনের আনুষ্ঠানিক সূচনা

ইরানে মার্কিন হামলার কেন্দ্রীয় ভূমিকায় এআই, ব্যবহৃত হচ্ছে যেভাবে

ইউক্রেনের পাশে দাঁড়ালেও ইরান প্রশ্নে নীরব কেন ব্রিটেন-ফ্রান্স

ইরান যুদ্ধ পতন ঘটাতে পারে তালেবানেরও

দুই মাসে নেই দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র—তবু চীন কেন চুপ