হোম > বিশ্লেষণ

ইরানের ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’: প্রতিবেশীদের আঙিনায় কেন বোমা ফেলছে তেহরান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন অগ্নিগর্ভ। সপ্তাহের শুরুতে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাত এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর খবর এই অঞ্চলকে এক নতুন ও ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। তেহরান কেবল ইসরায়েলকেই লক্ষ্যবস্তু করেনি, বরং তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে পারস্য উপসাগরীয় প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো। এমনকি ইরান সাইপ্রাস ও তুরস্কের দিকেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।

ইরান গত কয়েক দিনে কয়েকশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), সৌদি আরব, ওমান, বাহরাইন, কুয়েত এবং কাতারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায়। দুবাইয়ের বাণিজ্যিক বন্দর থেকে শুরু করে বাহরাইনের উপকূল—সবখানেই এখন যুদ্ধের কালো ধোঁয়া। সর্বশেষ তুরস্কের আকাশে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে ন্যাটোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

মজার বিষয় হলো, এই রাষ্ট্রগুলোর কোনোটিই আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে অংশ নেয়নি। তবুও ইরানের এই নির্বিচার হামলার পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশল। বিশ্লেষকেরা এটিকে ইরানের ‘কস্ট-শেয়ারিং’ নীতি হিসেবে দেখছেন—অর্থাৎ ইরান যদি আক্রান্ত হয়, তবে তার খেসারত পুরো অঞ্চলকে দিতে হবে।

কেন এই প্রতিবেশী দেশগুলো আক্রান্ত?

ইরানের সঙ্গে এই দেশগুলোর সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই জটিল। যদিও কাতার বা ওমান বিভিন্ন সময় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে, কিন্তু অধিকাংশ জিসিসি দেশের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক অনেকটা ‘সতর্কতামূলক শান্তি’র ওপর টিকে ছিল। হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ার সম্ভাব্য দুটি কারণ হলো—

১. মার্কিন সামরিক উপস্থিতি: ইরানের এই প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার প্রধান কারণ হলো সেখানে থাকা বিশাল মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর (ফিফথ ফ্লিট) এবং কাতারের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটি (যেখানে ১০,০০০ মার্কিন সেনা রয়েছে) হামলা চালিয়ে ইরান মূলত যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক কমান্ড বা সেন্টকমকে অচল করে দিতে চাচ্ছে। সেখানকার রাডার ব্যবস্থা বিকল করে দেওয়ার দাবি করেছে ইরান।

২. সহজ লক্ষ্যবস্তু: ইরান জানে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে হামলা করা অসম্ভব, কিন্তু আরবের এই ঘাঁটিগুলো তাদের মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের হাতের নাগালে।

ইরানের ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’ ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ

তেহরানের এই রণকৌশলের পোশাকি নাম ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’। এর অর্থ হলো নিজের সীমানার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শত্রুর মিত্রদের ওপর তাদের নিজ আঙিনায় হামলা চালানো। ইরান চায় প্রতিবেশীরা যেন অনুভব করে যে মার্কিন জোটের অংশ হওয়া বা তাদের ঘাঁটি রাখা নিরাপদ নয়। দুবাইয়ের মতো বাণিজ্যিক কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে ইরান বিশ্ববাসীকে বার্তা দিয়েছে যে, যুদ্ধ চললে মধ্যপ্রাচ্যের তথাকথিত ‘শান্তি ও সমৃদ্ধি’ চিরতরে শেষ হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া কাতার বা কুয়েতের মতো দেশগুলোকে ইরান এই কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে ফেলেছে যে—তারা কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকবে নাকি নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরত্ব বজায় রাখবে?

জ্বালানি তেল ও হরমুজ প্রণালি: বিশ্ব অর্থনীতির ওপর আঘাত

এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে তেলের বাজারে। বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল সরবরাহকারী ‘হরমুজ প্রণালি’ এখন কার্যত রণক্ষেত্র। ইতিমধ্যে দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি তৈরি হবে।

আঞ্চলিক ছায়া বাহিনী ও বহুমাত্রিক ফ্রন্ট

ইরান কেবল নিজের ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভর করছে না। লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুতি এবং ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে তারা ইসরায়েল ও পশ্চিমাদের জন্য একাধিক যুদ্ধের ফ্রন্ট খুলে রেখেছে। এটি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মনোযোগ ও রসদকে বিভিন্ন দিকে বিভক্ত করে ফেলার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল।

চূড়ান্ত প্রশ্ন: টিকে থাকার লড়াই?

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি ইরানের জন্য একটি ‘অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ’। তাদের অস্ত্রভান্ডার বিপুল হলেও তা অফুরান নয়। অন্যদিকে, এই কৌশলের কারণে ইরান পুরোপুরি বন্ধুহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিবেশীদের ওপর হামলা তাদের আরও বেশি সামরিক চাপের মুখে ফেলতে পারে।

ইরান কি পারবে এই বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে নিজের শাসনব্যবস্থাকে রক্ষা করতে? নাকি এই সর্বাত্মক যুদ্ধই হবে তেহরানের বর্তমান রেজিমের শেষ অধ্যায়? পুরো বিশ্ব এখন সেই উত্তরের অপেক্ষায়।

তুরস্কের আকাশে ইরানি ড্রোন, এরদোয়ান কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন

ইরাক যুদ্ধের শিক্ষা ভুলে গেছেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্র কি খাল কেটে আনা কুমির, এবার ভাববে জিসিসি দেশগুলো

ট্রাম্পের যুদ্ধের মস্তিষ্ক হয়ে উঠছে এআই, বিপজ্জনক ভবিষ্যতের পথে বিশ্ব

ইরানে হামলায় এআই ব্যবহার করছেন ট্রাম্প, কোন পথে বিশ্ব

ইরানেই থামবে না ইসরায়েলের আঞ্চলিক আধিপত্যের যুদ্ধ, ‘আমালেক’ হবে আরও বহু দেশ

ইরানে ৪-৫ সপ্তাহ যুদ্ধ চালাতে চান ট্রাম্প, অস্ত্রের মজুতে কুলাবে কি

ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা আর কত দিন টিকবে

ইরানের ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ ধ্বংস করা সহজ নয়

কে হচ্ছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা—খামেনির ছেলে নাকি খোমেনির নাতি