হোম > বিশ্লেষণ

ইরানে হামলায় এআই ব্যবহার করছেন ট্রাম্প, কোন পথে বিশ্ব

আবদুল বাছেদ

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

এক সময় ভাবা হতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কেবল আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়ে কাজগুলোকে সহজ করবে। বাজারের তালিকা তৈরি থেকে শুরু করে শিশুদের রূপকথার গল্প শোনানো কিংবা অফিসের কাজ গুছিয়ে দেবে। কিন্তু গত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করছে, এই প্রযুক্তি এখন আর কেবল একটি চ্যাটবট নয়; বরং এটি মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের এক অপরিহার্য ও ভয়ংকর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস গত তিন মাসে দুবার ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের অভিযানে এআইয়ের প্রত্যক্ষ সহায়তা নিয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য এক বিপজ্জনক মোড়।

প্রথমত, অ্যানথ্রোপিকের ‘ক্লদ’ এআই মডেলটি ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযানে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও এর বিস্তারিত কৌশল এখনো অস্পষ্ট, কিন্তু দ্বিতীয় দফায় ইরানের ওপর চালানো বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এর ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, তেহরানে নিখুঁত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং যুদ্ধের সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে সিমুলেশন চালানোর জন্য এই এআই প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করা হয়েছে। এই বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং উদ্বেগজনক। যে এআই মডেলকে মানুষ কভার লেটার লেখা বা ইমেইল সংক্ষেপ করার জন্য ব্যবহার করত, সেটিই এখন তথ্যকে মারণাস্ত্রের নির্দেশনায় রূপান্তরিত হচ্ছে।

এআইয়ের এই সামরিকীকরণ নিয়ে নৈতিক বিতর্কও এখন তুঙ্গে। অ্যানথ্রোপিকের সিইও ডারিও আমোদেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে এক প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন। তিনি ক্লদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুটি ‘রেড লাইন’ বা সীমারেখা শিথিল করতে অস্বীকার করেছিলেন। প্রথমত, এটি গণ-নজরদারিতে ব্যবহার করা যাবে না এবং দ্বিতীয়ত, এটি এমন কোনো স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হবে না যেখানে মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু আমোদেইর এই অসম্মতির পর ওপেনএআই দ্রুত পেন্টাগনের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে, যা প্রযুক্তি বিশ্বের নৈতিক অবস্থানকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

সামরিক ইতিহাসবিদদের মতে, যুদ্ধের ময়দানে এআইয়ের এই ব্যবহার অনেকটা জাপানে পারমাণবিক বোমা ফেলার মতো এক সন্ধিক্ষণ। এর আগে ‘মিউচুয়াল অ্যাসিউরড ডেসট্রাকশন’ বা পারস্পরিক ধ্বংসের ভয় দেশগুলোকে চূড়ান্ত অস্ত্র ব্যবহার থেকে বিরত রাখত। কিন্তু প্রাথমিক ওয়ার-গেম বা রণ-মহড়ায় দেখা গেছে, এআইয়ের নীতি-নির্ধারণ পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের চেয়েও অনেক বেশি বেপরোয়া। এআইয়ের এই ব্যবহার একবার স্বাভাবিক হয়ে গেলে বিশ্বের অন্যান্য দেশও একই পথে হাঁটবে, যা মানবিক নৈতিকতাকে যুদ্ধের ময়দান থেকে পুরোপুরি নির্বাসিত করবে।

এই ভয়ংকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ খুবই সংকীর্ণ। এক দশক আগে গুগল ডিপমাইন্ডের ডেমিস হাসাবিস প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁর প্রযুক্তি কখনোই সামরিক কাজে ব্যবহৃত হবে না। কিন্তু গত বছর সেই প্রতিশ্রুতি হাওয়ায় মিইয়ে গেছে এবং ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড সেই নৈতিক দেয়ালকে পুরোপুরি ধসিয়ে দিয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যাতে তারা এআইয়ের সামরিক ব্যবহারে আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। কারণ, যদি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী সাধারণ স্তরের এআই মডেলগুলোকে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে বৈধতা দেয়, তবে আমরা এমন এক অনিরাপদ পৃথিবীতে প্রবেশ করব যা হবে আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক।

তথ্যসূত্র: গার্ডিয়ান, বিবিসি, আল-জাজিরা

তুরস্কের আকাশে ইরানি ড্রোন, এরদোয়ান কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন

ইরাক যুদ্ধের শিক্ষা ভুলে গেছেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্র কি খাল কেটে আনা কুমির, এবার ভাববে জিসিসি দেশগুলো

ট্রাম্পের যুদ্ধের মস্তিষ্ক হয়ে উঠছে এআই, বিপজ্জনক ভবিষ্যতের পথে বিশ্ব

ইরানের ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’: প্রতিবেশীদের আঙিনায় কেন বোমা ফেলছে তেহরান

ইরানেই থামবে না ইসরায়েলের আঞ্চলিক আধিপত্যের যুদ্ধ, ‘আমালেক’ হবে আরও বহু দেশ

ইরানে ৪-৫ সপ্তাহ যুদ্ধ চালাতে চান ট্রাম্প, অস্ত্রের মজুতে কুলাবে কি

ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা আর কত দিন টিকবে

ইরানের ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ ধ্বংস করা সহজ নয়

কে হচ্ছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা—খামেনির ছেলে নাকি খোমেনির নাতি