অর্থ সংকটে জর্জরিত পাকিস্তান যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের অবসান ঘটানোর মধ্যস্থতার চেষ্টায় ব্যস্ত, তখন দেশটির দীর্ঘদিনের মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত হঠাৎ এক চমকপ্রদ দাবি তোলে। তাৎক্ষণিকভাবে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
চলতি মাসেই এই দাবি করে আবুধাবি। দেশটির এই দাবি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ শূন্য করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। পাশাপাশি ২০২৪ সালে আইএমএফ পাকিস্তানকে যে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেইলআউট প্যাকেজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় সেটিকেও বিপদে ফেলে। তবে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের আরেক মিত্র ও পারস্পরিক প্রতিরক্ষা অংশীদার সৌদি আরব এগিয়ে আসে। তারা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ শক্তিশালী করতে ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয় এবং বিদ্যমান ৫ বিলিয়ন ডলারের একটি ঋণের মেয়াদ এক বছরের বেশি সময়ের জন্য বাড়িয়ে দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, আবুধাবির এই সিদ্ধান্ত ইসলামাবাদের প্রতি তাদের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের প্রতিফলন। এর পেছনে একদিকে রয়েছে রিয়াদের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানি হামলার বিষয়ে পাকিস্তানের ‘নরম’ প্রতিক্রিয়া।
ব্রিটিশ থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউসের অ্যাসোসিয়েট ফেলো নীল কুইলিয়াম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা উপসাগরীয় এই রাষ্ট্রকে আরও বিরক্ত করেছে, কারণ বর্তমানে তারা বিষয়গুলোকে ‘সাদা-মাটা দৃষ্টিভঙ্গিতে’ দেখছে। তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে আমিরাতের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো নিরপেক্ষতা নেই, কোনো মধ্যপন্থা নেই। আর আপনি যদি মধ্যস্থতা করেন, তাহলে আপনি আসলে সেই মধ্যপন্থাতেই অবস্থান করছেন।’
এর পেছনে রয়েছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দীর্ঘদিনের চাপা উত্তেজনা। গত সেপ্টেম্বর ইসলামাবাদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করা সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে সম্পর্কের এই ফাটল ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধকে ঘিরে প্রকাশ্যে আসে। ইয়েমেন এই দুই দেশ ভিন্ন ভিন্ন পক্ষকে সমর্থন করছে। গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে এই বিরোধ প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ সাময়িকভাবে এই দ্বন্দ্ব আড়াল করে দেয়। কারণ, মার্কিন–ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান উভয় উপসাগরীয় রাষ্ট্রেই মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালায়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি-আমিরাত উত্তেজনা এখনো অব্যাহত। রিয়াদ এখন তার উপসাগরীয় প্রতিবেশীর তুলনায় পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসরের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ। কুইলিয়াম বলেন, ‘এই দ্বন্দ্ব এখনো আছে এবং পাকিস্তান এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে এটি প্রকাশ পেতে পারে। তা ছাড়া আমিরাত পাকিস্তানের তুলনায় ভারতে বেশি বিনিয়োগ করেছে। তারা সৌদি আরব ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান জোটকে দেখছে, যা আবুধাবির স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’
পাকিস্তানের তিন উপদেষ্টা জানান, আমিরাত ইসলামাবাদকে ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে চায়। যদিও আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। আমিরাতি বিশ্লেষক আবদুলখালেক আবদুল্লাহ বলেন, ‘আবুধাবিতে হতাশা রয়েছে। ইসলামাবাদ নিজেদের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে, যা ভালোভাবে নেওয়া হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবে অসন্তুষ্ট হওয়া এক বিষয়, আর এর ভিত্তিতে পুরো সম্পর্ক নতুন করে ভাবা আরেক বিষয়।’
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য এই অর্থ ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘নিয়মিত আর্থিক লেনদেন’ বলে উল্লেখ করেছে এবং উপসাগরীয় যুদ্ধের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছে। একই সঙ্গে ইসলামাবাদ ও আবুধাবির মধ্যে ‘কোনো দূরত্ব নেই’ বলেও জানানো হয়েছে।
তবে আড়ালে ইসলামাবাদের কর্মকর্তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে উপদেষ্টারা জানান। যদিও তারা এটিকে কিছুটা স্বস্তির দিক হিসেবেও দেখছেন। কারণ, এতে তারা আবুধাবির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমাতে পারছে। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন আমিরাত পাকিস্তানের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। এক উপদেষ্টা বলেন, ‘সৌদিরা আমাদের অনুরোধ রেখেছে, যা তারা সাধারণত করে থাকে।’
পাকিস্তান ও আমিরাতের সম্পর্কের সূচনা ১৯৭১ সালে, যখন আবুধাবি যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। আমিরাতের বিমানবাহিনীর প্রথম পাঁচ প্রধানই ছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক। একই সময়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস আমিরের এয়ারলাইনসকে বিমান ও প্রশিক্ষণ সহায়তা দিয়েছে। এর বিপরীতে আমিরাত পাকিস্তানকে বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা দিয়েছে এবং বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ পাকিস্তানি প্রবাসী সেখানে বসবাস করছেন।
তবে ২০১৫ সালে সম্পর্কের টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে সময় ইসলামাবাদ জনমতের চাপে নতিস্বীকার করে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ওই সংঘাতে সৌদিদের প্রধান অংশীদার ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। তখন এক শীর্ষ আমিরাতি কূটনীতিক প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, আমিরাতের ‘অনিবার্য’ অর্থনৈতিক ও আর্থিক সহায়তা থাকা সত্ত্বেও ‘তেহরান যেন ইসলামাবাদের কাছে উপসাগরীয় দেশগুলোর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ’ হয়ে উঠেছে।
গত বছরের শেষ দিক থেকে পাকিস্তান অন্তত ২০০ কোটি ডলারের আমিরাতি ঋণ দুই বছরের জন্য নবায়নের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। তবে বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুজনের ভাষ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে মাসিক ভিত্তিতে ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে আবুধাবি ইসলামাবাদকে অস্বস্তিতে ফেলে। এ মাসে তাৎক্ষণিক ঋণ পরিশোধ চাওয়ার সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে (আইএমএফ) বিস্মিত করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। আবুধাবি আগে আইএমএফকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, পাকিস্তানের ২০২৭ সাল পর্যন্ত চলমান কর্মসূচি শেষ হওয়ার আগে তারা ঋণ ফেরত চাইবে না—যা ছিল বেইলআউট অনুমোদনের পূর্বশর্ত।
ইসলামাবাদে আইএমএফের প্রতিনিধি মাহির বিনিচি এক বিবৃতিতে বলেন, কর্মসূচির অধীনে ‘রিজার্ভ পর্যায়ের প্রতিশ্রুতি’ পূরণে পাকিস্তান ‘দ্বিপক্ষীয় অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা এবং বাজারে প্রবেশাধিকার’ ব্যবহার করে অর্থায়নের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে পাঠানো অনুরোধের জবাব দেয়নি পাকিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয়।
এই পদক্ষেপে পাকিস্তানের একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনারও অবসান ঘটে। ডিসেম্বরে আবুধাবির সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে ১০০ কোটি ডলারের ঋণকে সামরিক-সম্পর্কিত কনগ্লোমারেট ‘ফৌজি ফাউন্ডেশনে’ বিনিয়োগে রূপান্তরের কথা বলেছিলেন পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত দুজন এখন জানিয়েছেন, এটি বাতিল করা হয়েছে এবং নির্ধারিত অর্থ আমিরাতকে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
তবে কিছু পর্যবেক্ষক সতর্ক করেছেন, সৌদি আরবের অর্থায়নের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি বাড়ছে। বর্তমানে এই সহায়তা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১৬০০ কোটি ডলারের রিজার্ভের প্রায় অর্ধেকের সমান।
অর্থনৈতিক চাপে থাকার আরেকটি ইঙ্গিত হিসেবে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোমবার নীতি সুদহার ১০০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করেছে। প্রায় তিন বছরের মধ্যে এটি প্রথম বৃদ্ধি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে উদ্ভূত মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশা এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মুদ্রানীতি বিবৃতিতে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছে।
পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতার বিনিময়ে সৌদি বিনিয়োগ ও আর্থিক সহায়তা বাড়ার আশা জাগিয়েছিল। তবে পাকিস্তানের দুই উপদেষ্টা জানিয়েছেন, ব্যাপক অভ্যন্তরীণ আর্থিক দায় সামলাতে গিয়ে তারল্য সংকট ও বাজেট ঘাটতির মুখে থাকা রিয়াদ এখন পর্যন্ত এই চুক্তিকে বিনিয়োগে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে খুব সীমিত আগ্রহ দেখিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর, এ মাসে পাকিস্তান তাদের চুক্তির অংশ হিসেবে সৌদি আরবে যুদ্ধবিমান ও সহায়ক বিমান মোতায়েন করেছে বলে জানিয়েছে রিয়াদ। তবে এই চুক্তির অস্তিত্ব ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ার–ইস্ট বিষয়ক অধ্যাপক বার্নার্ড হেইকেল বলেন, ‘সৌদিরা কখনোই পাকিস্তানের সহায়তা নিয়ে কোনো বিভ্রমে ছিল না। তারা কেবল আশা করেছিল, এতে ইরান হয়তো হামলার আগে দুবার ভাববে। কিন্তু সেটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাকিস্তানকে আর্থিকভাবে উদ্ধার করার সামর্থ্য সৌদি আরবের নেই।’
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান