হোম > বিশ্লেষণ

ইরানে আর শাসকশ্রেণির পরিবর্তন চান না ট্রাম্প, শাসকদের আচরণ পরিবর্তন হলেই খুশি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

বোর্ড অব পিসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এক্স

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের ওপর শত শত ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করছেন, তখন সবার মুখে একটি প্রশ্ন—তিনি কি ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পথে হাঁটছেন? মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট নাহাল তুসির বিশ্লেষণ বলছে, ট্রাম্পের এই যুদ্ধের লক্ষ্য মোটাদাগে ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ নয়, বরং শাসকদের ‘আচরণ পরিবর্তন’। ট্রাম্পের কাছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার চেয়ে তাঁর বশ্যতা স্বীকারকারী সরকার বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেটি স্বৈরশাসক হলেও তাঁর আপত্তি নেই।

পেন্টাগন এবং হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের মতে, ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো ‘স্টেট বিল্ডিং’ বা নতুন রাষ্ট্র গঠনের ঝামেলায় ট্রাম্প জড়াতে চান না। একজন মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ‘আমাদের কাছে রেজিম চেঞ্জের নতুন সংস্করণ হলো শাসকশ্রেণির আচরণ পরিবর্তন। অর্থাৎ, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো বা আইআরজিসির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকলেও যদি তারা আমেরিকার স্বার্থবিরোধী কাজ (যেমন পারমাণবিক কর্মসূচি বা সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন) বন্ধ করে দেয়, তবে ট্রাম্প তাতেই সন্তুষ্ট হতে পারেন। একে অনেকে ‘রেজিম ট্রান্সফরমেশন’ বা শাসনব্যবস্থার রূপান্তর হিসেবেও দেখছেন।

ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের কৌশল সফল হয়েছে। নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করে নিউইয়র্কে নিয়ে আসার পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত ডেলসি রদ্রিগেজ এখন আমেরিকার সঙ্গে জ্বালানি ও বন্দি মুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। ট্রাম্প তাঁকে ‘নতুন বন্ধু’ হিসেবেও অভিহিত করেছেন। কিউবার ক্ষেত্রেও ট্রাম্প সামরিক হামলা না চালিয়ে ‘ইকোনমিক চোক হোল্ড’ বা অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরোধ করার নীতি নিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আভাস দিয়েছেন, কিউবা যদি ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক সংস্কার করে, তবে আমেরিকা সাহায্য করতে রাজি। অর্থাৎ, পুরো শাসনব্যবস্থা একবারে বদলানোর চেয়ে তাদের আচরণকে মার্কিন স্বার্থের অনুকূলে আনাই ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।

ইরানের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের বাজি অনেক বেশি বিপজ্জনক। খামেনিকে হত্যার পর ট্রাম্প এখনো বলছেন, তিনি ইরানের অবশিষ্ট নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি। কিন্তু ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানি ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান আমেরিকার সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসবে না। ট্রাম্পের আশা হলো ইরানের সশস্ত্র বাহিনী হয়তো ‘ইরানি দেশপ্রেমিকদের’ সাথে মিশে গিয়ে একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি করবে। কিন্তু বাস্তবে যদি কোনো নেতৃত্ব আলোচনা করতে রাজি না হয়, তবে ইরান একটি ‘ফেইলড স্টেট’ বা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে, যা হবে বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় আতঙ্ক।

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় অংশ হলো ব্যক্তিগত রসায়ন। ভেনেজুয়েলার রদ্রিগেজের সঙ্গে তার সখ্যতা যেভাবে কাজ করছে, ইরানেও তিনি এমন কাউকে খুঁজছেন যিনি তার শর্ত মেনে নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে তার আস্থা অর্জন করবেন। ট্রাম্পের কাছে ‘আমেরিকান ভ্যালুজ’ (গণতন্ত্র বা মানবাধিকার)-এর চেয়ে ‘আমেরিকান ইন্টারেস্ট’ (নিরাপত্তা ও ব্যবসা) অনেক বেশি অগ্রাধিকার পায়।

ট্রাম্পের বর্তমান সামরিক অভিযান কেবল ইরান ধ্বংস করা নয়, বরং দেশটির ডিএনএ বদলে দেওয়ার চেষ্টা। তিনি চান তেহরান যেন এমনভাবে আচরণ করুক, যা ওয়াশিংটনের জন্য হুমকিস্বরূপ নয়। যদি ইরান, ভেনেজুয়েলা বা কিউবার অবশিষ্টাংশ ট্রাম্পের শর্তে মাথা নত করে, তবে ট্রাম্প হয়তো তাদের টিকে থাকতে দেবেন। কিন্তু এই ‘বিহেভিয়ার চেঞ্জ’ বা আচরণ পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত দেশগুলোর সাধারণ মানুষের জন্য রাজনৈতিক স্বাধীনতা আনবে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

পলিটিকো থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতে ঘড়ি—কিন্তু সময় ইরানের পক্ষে

ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য তিন পরিণতি

খামেনি নেই, ইরানের নাটাই এখন কার হাতে

লারিজানি-হাসান রুহানিদের পথে যাবে ইরান, নাকি খামেনির আপসহীন নীতিতে থাকবে অটল

খামেনি নন, নাটের গুরু আইআরজিসি—বোঝেননি ট্রাম্প

ইরান এবার মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে নেমেছে, কতক্ষণ লড়তে পারবেন ট্রাম্প

যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানে ‘পুনর্গঠন-বাণিজ্য’ করবে চীন, কিনবে সস্তায় তেল

ইরান হামলায় যুক্তরাষ্ট্র কী কী অস্ত্র ব্যবহার করছে, ব্যয় অবিশ্বাস্য

হরমুজ প্রণালি বন্ধ: মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত মোড় নিচ্ছে জ্বালানি যুদ্ধে, বৈশ্বিক মন্দার পদধ্বনি

বল এখন ইরানের আমজনতার কোর্টে, তাঁরা কি পারবেন ইতিহাস গড়তে