হোম > বিশ্লেষণ

ইন্ডিয়া কি বিদেশে ‘ভারত’ নামে পরিচিত হতে চায়  

আব্দুর রহমান

বিশ্বের দরবারে ইন্ডিয়া কি ‘ভারত’ নামে পরিচিত হতে চাচ্ছে। জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে দেশটির রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দুটি আমন্ত্রণপত্র থেকে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কার্যালয় থেকে জি-২০ সম্মেলনের বিদেশি অতিথিদের কাছে পাঠানো আমন্ত্রণপত্রে বরাবরের মতো ‘প্রেসিডেন্ট অব ইন্ডিয়া’ ব্যবহার না করে ‘প্রেসিডেন্ট অব ভারত’ ব্যবহার করা হয়েছে। এনিয়ে ভারতজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর এক আমন্ত্রণপত্রেও ‘প্রাইম মিনিস্টার অব ভারত’ লেখা হয়েছে। নির্বাচনের আগে ‘রাজনৈতিক ফায়দা’ হাসিলের জন্যই ক্ষমতাসীন বিজেপি নাম পাল্টানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ।

দ্রৌপদী মুর্মুর কার্যালয় থেকে জি-২০-এর রাষ্ট্র এবং সরকারপ্রধানদের কাছে পাঠানো আমন্ত্রণপত্রে ভারতের ইংরেজি নাম ‘ইন্ডিয়া’র বদলে ‘ভারত’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এদিকে ইন্দোনেশিয়ায় আসিয়ান-ভারত সম্মেলনের বিষয়ে প্রকাশিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি নোটে ‘প্রাইম মিনিস্টার অব ভারত’ লেখা হয়েছে।

বিরোধীদের দাবি, ‘ইন্ডিয়া’ নামে তাদের রাজনৈতিক জোটকে হেয় করতেই বিজেপি এমন উদ্যোগ নিয়েছে বলে মনে করেন। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা শশী থারুর বলেছেন, ইন্ডিয়া পুরোপুরি বাদ দিয়ে ইংরেজিতে ভারত ব্যবহার করা হবে বোকামি।

এ বিষয়ে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী এবং ইন্ডিয়া জোটের সদস্য আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলেন, ‘এমনটা কেন ঘটছে? অনেকে বলছেন, আমরা আমাদের জোটের নাম ইন্ডিয়া রেখেছি বলেই তাঁরা এমনটা করছে। এই দেশ ১৪০ কোটি মানুষের, কোনো বিশেষ দলের নয়।’ জোটের নাম বদলে ‘ভারত’ রাখা হলে বিজেপি ভারত নামও কি বদলে দেবে বলে প্রশ্ন রাখেন তিনি।

তবে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বিজেপি নেতারা বলছেন, ভারতের সংবিধানের ১ নম্বর অনুচ্ছেদেই ভারতের নাম ভারত হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘ইন্ডিয়া, যা ভারত নামে পরিচিত।’ তাই রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করায় কোনো সমস্যা নেই।

ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, ‘এটি আরও আগেই হওয়া উচিত ছিল। এটি মনের তৃপ্তি জোগায়। ভারত আমাদের পরিচয়। আমরা এটি নিয়ে গর্বিত। রাষ্ট্রপতি ভারতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার এটাই সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ।’

ভারত সরকার আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর লোকসভার বিশেষ অধিবেশন ডেকেছে। তবে এই অধিবেশনের আলোচ্যসূচি এখনো জানানো হয়নি। তবে অনেকেই আশা করছেন, ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া লোকসভার বিশেষ অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের ইংরেজিও নামও ভারত করার প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। তবে বিষয়টি নিয়ে বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

তবে ইংরেজিতে ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে ‘প্রেসিডেন্ট অব ইন্ডিয়া’ ও ‘প্রাইম মিনিস্টার অব ইন্ডিয়ার’ বদলে যথাক্রমে ‘প্রেসিডেন্ট অব ভারত’ এবং ‘প্রাইম মিনিস্টার অব ইন্ডিয়া’ লেখায় আইনগত বা সাংবিধানিক কোনো ব্যত্যয় ঘটছে কিনা তাই বিবেচ্য। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইংরেজি ইন্ডিয়ার পরিবর্তে ইংরেজিতে ভারত লেখা যাবে। তবে সেটি শর্ত সাপেক্ষে।

এ বিষয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং কংগ্রেস সদস্য অভিষেক সাংভি বলেন, ‘বিষয়টি হলো, ভারত এবং ইন্ডিয়া নাম দুটিকে একটির বদলে অপরটি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। বিশেষ করে ভারতীয় সংবিধানের হিন্দি ভার্সনের ক্ষেত্রে এটি করা যাবে। কিন্তু সরকার কাউকে কেবল একটি নামে ভারতকে ডাকতে বাধ্য করার শর্ত আরোপ করতে পারে না। এটি কেবল তখনই সম্ভব যখন এর অনুমোদন দেওয়া হবে কিংবা একটির বদলে আরেকটিকে ব্যবহার করা হবে।’

ভারতের লোকসভার সাবেক এই সদস্য এক সময় আইন ও বিচার বিষয়ক পার্লামেন্টারি স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকার যদি কেবল কোনো একটি নামকে ব্যবহার করতে চায় কিংবা কোনো একটি নির্দিষ্ট নামকে বাতিল করতে চায় তাহলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।

ভারতের সাবেক সলিসিটার জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আমান লেখি বলেন, ভারতের অফিশিয়াল নাম হলো রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া। এমনকি জি-২০ সম্মেলনেও ভারত পরিচিত হচ্ছে ‘ইন্ডিয়ান প্রেসিডেন্সি’ হিসেবে। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে গেলে সংবিধানের ৩৬৮ অনুচ্ছেদ সংশোধন করতে হবে। লেখি বলেন, এই পরিবর্তন সম্ভব তবে এর কী আসলেই কোনো প্রয়োজনীয়তা রয়েছে—প্রশ্ন রাখেন তিনি।

ভারতের আরেক সংবিধান বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট অব ভারত’-পরিচয়ে আমন্ত্রণপত্র পাঠানোতে কোনো সমস্যা নেই। তবে এতে সরকার ভারতের ইংরেজি নামের ব্যবহার থেকে চিরদিনের জন্য সরে যাচ্ছে এমনটা ভাবা উচিত হবে না।

তবে ওই আইনজীবী আরও বলেন, সরকার যদি ইংরেজি নাম বদলাতে চায় তবে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। তিনি বলেন, ‘ভারতীয় সংবিধানের ৩৪৮ এর অনুচ্ছেদ-১ এ বলা হয়েছে পার্লামেন্ট নতুন আইন পাশ না করা পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট এবং দেশের প্রতিটি হাই কোর্টের কার্যক্রম চলবে ইংরেজিতে।’ ওই আইনজীবীর মতে, এ ক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সেটি করতে গেলেই এই ইস্যু ভারতের ফেডারেল ইস্যুতে পরিণত হবে এবং তখন সব রাজ্যেরই সম্মতির প্রয়োজন পড়বে।

এর আগে, ভারতে সরকারি ভাষা কি হবে তা নিয়ে বিতর্কের সূচনা হয়। গত মাসে ভারতীয় লোকসভার বর্ষা অধিবেশনে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ইন্ডিয়ান পেনাল কোড, দ্য কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর এবং এভিডেন্স অ্যাক্টের নাম ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, ভারতীয় নাগরিক সংহিতা এবং ভারতীয় সাক্ষ্য বিল হিসেবে উপস্থাপন করলে দেশজুড়ে বিষয়টি নিয়ে তীব্র বিতর্ক সূচনা হয়।

যা হোক, ভারত বিজেপি সরকার কেন হঠাৎ এই বিষয়টি নিয়ে এভাবে মাঠে নেমেছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিশ্লেষকদের মন্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, বিজেপি সরকার চাইলেই ভারতের ইংরেজি নাম ইন্ডিয়া বদলে ভারত করতে পারবে না। বিষয়টি ফেডারেল ইস্যুতে পরিণত হওয়ায় এ বিষয়ে ভারতের সবগুলো রাজ্যের একমত হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে আইনের ফাঁক গলে সরকার হয়তো ইন্ডিয়ার বিকল্প হিসেবে ভারত শব্দটি ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু এটিকে বাধ্যতামূলক করতে পারবে না।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি ও দ্য হিন্দু

যেভাবে এবং যেসব কারণে আন্দোলনকে পুঁজি করে ইরানকে ভাঙতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল

ইরানের বিক্ষোভে কোন পক্ষে তুরস্ক, কী চায় তারা

যুক্তরাষ্ট্রকে ভয় পাওয়ার ক্লাস নিচ্ছেন ট্রাম্প

ইরানে ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট ও চোরাচালান রুট— দুটোই বিপ্লবী গার্ডের নিয়ন্ত্রণে

প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে দুর্বল পাকিস্তান কীভাবে আধুনিক যুদ্ধবিমান বানাল

পাকিস্তানের জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান: বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের আগ্রহের কারণ কী

ইরান ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নেওয়া কেন এত কঠিন

চীন-রাশিয়ার সঙ্গে ব্রিকসের সামরিক মহড়ায় আছে ইরান, নেই ভারত—কারণ কী

‘ইরানিদের হাতেই হবে তেহরানের শাসন পরিবর্তন, শুরুটা আগামী বছরই’

বিক্ষোভ মোকাবিলায় ইরান কেন আগের মতো কঠোর হচ্ছে না