হোম > বিশ্লেষণ

ইরানেই থামবে না ইসরায়েলের আঞ্চলিক আধিপত্যের যুদ্ধ, ‘আমালেক’ হবে আরও বহু দেশ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদী মনোভাবের বলি হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের আরও অনেক দেশ। ছবি: এএফপি

তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধে শনিবার ভোরে প্রথম আঘাত উদযাপন করে ইসরায়েলিরা ও ইরানি প্রবাসীদের একটি অংশ উদযাপন করে। সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের আরও কয়েক ডজন শীর্ষ নেতা নিহত হন।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভা ও ওমানে চলমান আলোচনায় ইরানি প্রতিনিধিদল সেই হামলার সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছিল। প্রধান আলোচক ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল-বুসাইদি জানান, ইরান তাদের সম্পূর্ণ উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত লঘু করতে রাজি হয়েছিল, আন্তর্জাতিকভাবে যাচাইয়ের শর্তে। এতে তা বোমা তৈরির উপাদান হিসেবে অকার্যকর হয়ে যেত।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধের পথ বেছে নেন। আলোচনাগুলো শুরু থেকেই ছিল প্রহসন। যেমনটি ছিল গত জুনেও। সে সময়ও যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল প্রথমবারের মতো ইরানে হামলা চালায়। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ মাসের পর মাস ধরে খামেনির গতিবিধি নজরদারিতে রেখেছে। ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব একসঙ্গে জড়ো হওয়ার মুহূর্তটির জন্যই অপেক্ষা করছিল এই হামলা। শনিবার পাশাপাশি দুটি ভবনে দুটি বৈঠকে শীর্ষ নেতারা উপস্থিত হলে ইসরায়েল আঘাত হানে।

একই ভাষ্য উচ্চারিত হচ্ছিল ওয়াশিংটন ও তেল আবিব থেকেও। ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানিদের রাস্তায় নামতে এবং শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে আহ্বান জানান। জানুয়ারিতেও একই চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ঘটনা সে পথে যায়নি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান প্রথম দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে জবাব দেয়।

খামেনির মৃত্যুর নিশ্চিত খবর পৌঁছালে ইরানিরা রাস্তায় নেমেছিল, তবে সেটা ছিল শোক মিছিল, উদযাপন নয়। তেহরানের একবাতান এলাকার মতো কিছু পাড়ায় মানুষ নিজেদের ফ্ল্যাটের আপেক্ষিক নিরাপদ গোপনীয়তা থেকে উল্লাস করেছিল। কিন্তু শহরের অন্য অংশে শোনা গেছে আর্তচিৎকার। অনেকেই না উল্লাস করেছে, না শোক প্রকাশ করেছে—তারা কেবল সামনে কী আসছে, সেই আশঙ্কায় দিন গুনছে।

শাসন পরিবর্তনের যুদ্ধ

প্রথম মুহূর্ত থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়, এই যুদ্ধ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে নয়; এটি শাসন পরিবর্তনের যুদ্ধ। এই শাসন পরিবর্তনের বিরুদ্ধেই ট্রাম্প ও পুরো মাগা (মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন) আন্দোলন প্রচারণা চালিয়েছিল দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে এবং পরে। ২০২৩ সালে নিউ হ্যাম্পশায়ারের এক নির্বাচনী ভাষণে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমরা ডিপ স্টেট ধ্বংস করব। আমরা উষ্ণ–যুদ্ধপ্রিয়দের, সেই ভয়ংকর উষ্ণ–যুদ্ধপ্রিয়দের আমাদের সরকার থেকে বহিষ্কার করব—সেই বোকা, বোকা মানুষগুলোকে। তারা মানুষকে মরতে দেখতে ভালোবাসে। আমরা গ্লোবালিস্টদের বিতাড়িত করব।’

প্রেসিডেন্ট হিসেবে গত মে মাসে রিয়াদে ট্রাম্প বলেছিলেন, তথাকথিত ‘নেশন বিল্ডাররা’ যত দেশ গড়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি দেশ ধ্বংস করেছে। আর হস্তক্ষেপবাদীরা এমন জটিল সমাজে হস্তক্ষেপ করেছে, যা তারা নিজেরাই বুঝত না। এখন তিনি উপসাগরে একটি বড় যুদ্ধ শুরু করেছেন। কেন করেছেন, তা ব্যাখ্যা করা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। কখনো তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, কখনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, কখনো বিক্ষোভকারীদের সহায়তা, কখনো শাসন পরিবর্তনের কথা বলেছেন।

সোমবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আরেকটি কারণ যুক্ত করেন। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ছিল ‘প্রাক্-প্রতিরোধমূলক।’ কারণ, যুক্তরাষ্ট্র জানত ইসরায়েল হামলার জন্য প্রস্তুত, এবং যদি তা ঘটত, তবে পাল্টা আঘাতের প্রধান ভার বহন করতে হতো যুক্তরাষ্ট্রকেই। তাহলে কি রুবিও স্বীকার করছেন যে, তাঁর সর্বাধিনায়ককে ইসরায়েল টেনে নিয়ে গেছে পূর্ণমাত্রার উপসাগরীয় যুদ্ধে? ট্রাম্প মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, ‘যদি কিছু হয়ে থাকে, তবে আমিই হয়তো ইসরায়েলকে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছি।’

যাই হোক, নেতানিয়াহু বরাবরই ইরানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আঘাত হানার ইচ্ছায় স্থির ছিলেন। তিনি ইরানকে ‘আমালেক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং তাদের পঙ্গু করে দেওয়ার কথা বলেছেন। আমালেক বলতে বাইবেলীয় ঐতিহ্যে একটি প্রাচীন জাতি বোঝানো হয়, যারা ইসরায়েলিদের প্রধান শত্রু।

প্রায় ৪৭ বছর ধরে নেতানিয়াহু এই দিনের জন্য অপেক্ষা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, পরে বিরোধী রাজনীতিক হিসেবে, আবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে—বারবার তিনি তাঁর সেনাবাহিনী এবং যুক্তরাষ্ট্রকে এ ধরনের হামলায় রাজি করানোর চেষ্টা করেছেন। একাধিকবার তিনি প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। গত জুনের মতো সীমিত সময়ের হামলা নয়, বরং ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করতে সর্বাত্মক যুদ্ধ—এটাই ছিল তাঁর লক্ষ্য।

ইরানকে ভেঙে ফেলা

শনিবারের ভাষণে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের কৌশল স্পষ্ট করেন। তিনি ইরানিদের জাতীয় পরিচয়ে নয়, জাতিগত পরিচয়ে সম্বোধন করেন—‘পারসিক, কুর্দি, আজেরি, বেলুচ, আবখাজিয়ান এবং এই মহান জাতির অন্যান্য নাগরিকেরা।’ তাঁর ভাষণের আগে যে বোমাগুলো পড়েছিল, সেগুলোর লক্ষ্যবস্তুই ছিল একই কৌশলের প্রতিফলন। ইরানের রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণির সব ধারাই নিশানায় ছিল—সংস্কারপন্থী, বামপন্থী, সাবেক প্রেসিডেন্টরা, এমনকি মূলধারার রক্ষণশীলরাও।

নেতানিয়াহুর ভাষণ বা পদক্ষেপের কোনোটিই ইসলামি প্রজাতন্ত্র পতনের পর নতুন কোনো নেতৃত্ব গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ছিল না। বরং লক্ষ্য ছিল ইরানকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করে দেওয়া—জাতিগত ছোট ছোট এলাকায় বিভক্ত একটি শিথিল কনফেডারেশনে পরিণত করা। ইসরায়েল সিরিয়ায় একই কাজ করার চেষ্টা করলেও সফল হয়নি।

শনিবারের ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, ‘নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে নিন। মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকান; আমাদের বাহিনী সেখানে আছে, মুক্ত বিশ্বের পাইলটরা আপনাদের সহায়তায় আসছে। সাহায্য এসে গেছে।’ কিন্তু ইরানিরা দেখেছে, সেই তথাকথিত মুক্ত বিশ্বের পাইলটরা একটি স্কুলে বোমা মেরে ১৮০ জনকে হত্যা করেছে, যাদের বেশির ভাগই ছিল কিশোর-কিশোরী। হাসপাতালেও হামলা হয়েছে। প্রধান শহরগুলোও রক্ষা পায়নি।

ইসরায়েল ইরানের শহরগুলোকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে শুরু করেছে—যেমনটি তারা গাজায় করেছে, কিংবা দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুতের কিছু অংশে করেছে। এর ফলে তথাকথিত ‘নির্ভুল’ বোমাবর্ষণে মাত্র চার দিনেই ইরানে নিহতের সংখ্যা ৭৫০ ছাড়িয়েছে। নেতানিয়াহুর লক্ষ্য ইরানকে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ধ্বংস করা।

ইরানি জনগণকে তথাকথিত স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্তি তাঁর অগ্রাধিকারের তালিকায় অনেক নিচে। যুদ্ধপরবর্তী পরিকল্পনার কোনো স্পষ্ট রূপরেখা নেই। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন হলে তার স্থলাভিষিক্ত কোন শাসনব্যবস্থা আসবে, প্রবাসে থাকা কোনো ইরানি রাজনৈতিক নেতা বা আন্দোলনের দেশের ভেতরে বাস্তব সমর্থন কতটুকু—এসব নিয়ে ন্যূনতম ভাবনাও দেখা যায় না। ইরানকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ধ্বংস করার এই লক্ষ্য বৃহত্তর এক পরিকল্পনার অংশ। এমন এক পরিকল্পনা, যার কেন্দ্রে রয়েছে দুটি শব্দ—যা ইসরায়েলের বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার নেতাদের মুখে ক্রমশ উচ্চারিত হচ্ছে বেশি করে: গ্রেটার ইসরায়েল।

ভারতের সঙ্গে মৈত্রী

এই হামলার ঠিক আগমুহূর্তে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেগুলো নিছক কাকতাল নয়। ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের দূত মাইক হাকাবি মার্কিন সাংবাদিক টাকার কার্লসনকে বলেছিলেন, ইসরায়েল যদি নীলনদ থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত সব জমি নিয়ে নেয়, তাতেও কোনো সমস্যা নেই। ইসরায়েলি বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ সঙ্গে সঙ্গেই এতে সম্মতি জানান। এটাও কাকতাল নয়।

লাপিদ কিপা নিউজকে বলেন, ‘আমি এমন যেকোনো কিছুর পক্ষেই আছি, যা ইহুদিদের জন্য একটি বড়, বিস্তৃত, শক্তিশালী ভূমি এবং আমাদের, আমাদের সন্তানদের ও আমাদের সন্তানদের সন্তানের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করবে। সেটাই আমি সমর্থন করি।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইসরায়েলের ভূখণ্ড ইরাক পর্যন্ত সম্প্রসারিত হতে পারে।

এই যুদ্ধ শুরুর অল্প সময় আগে নেতানিয়াহু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেন—এটাও কাকতাল নয়। আমার সহকর্মী এবং ‘হোস্টাইল হোমল্যান্ডস’ বইয়ের লেখক আজাদ ঈসা বলেন, দিল্লি এখন ইসরায়েলের সবচেয়ে শক্তিশালী অ-পশ্চিমা মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা এবং আদর্শিক সাযুজ্য রয়েছে, যা (গাজা) গণহত্যার সময় আরও শক্তিশালী হয়েছে।’ সাম্প্রতিক সফরে মোদি আগামী বছরগুলোতে আরও ৫০ হাজার ভারতীয় নাগরিককে ইসরায়েলে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের জোটে ভারত অর্থনৈতিক পরিসর, বাজারে প্রবেশাধিকার, শ্রমশক্তি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমন্বয় নিয়ে আসবে। বহু দিক থেকেই ইতিমধ্যে তা করছে। ভারত ইতিমধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদন করছে। অর্থাৎ, ইসরায়েলের জন্য একটি কারখানায় পরিণত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে ভারত ইসরায়েলের ঘাটতি পূরণ করবে এবং ফিলিস্তিনিদের বদলে এক ধরনের শ্রম-প্রতিস্থাপন হিসেবে কাজ করবে।’

এই যুদ্ধের দ্বিতীয় বিষয়টি হলো এর সময়কাল। নেতানিয়াহু সঠিকভাবেই হিসাব করেছেন, ট্রাম্পের মতো অনুগত ও সহজে প্রভাবিত করা যায়—এমন কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরায়েল আর কখনো পাবে না। রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট—কেউই ট্রাম্প এবং তাঁর পূর্বসূরি জো বাইডেনের মতো ইসরায়েলপন্থী হবেন না। গাজায় সংঘটিত গণহত্যা সেই বাস্তবতা তৈরি করেছে।

তবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ ইতিমধ্যেই ইসরায়েলকে এমন এক পুরস্কার দিয়েছে, যার মূল্য তার প্রথম মেয়াদে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া বা গোলান মালভূমি সংযুক্তির চেয়েও বেশি। ট্রাম্প এখন ওয়াশিংটনের আশীর্বাদ দিয়ে ইসরায়েলকে যে কোনো নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডে—তা লেবানন, সিরিয়া, ইরাক বা মিসর যেখানেই হোক—সীমানা সম্প্রসারণের অনুমোদন দিয়েছেন। এটাই বহুরঙা জায়নবাদীদের বহু দশকের লালিত স্বপ্ন—একদিন ইসরায়েল নীলনদ থেকে ইউফ্রেটিস বা ইরাকের ফোরাত পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

নয়া বাস্তবতা

অতএব, এখন সময় শুধু ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে চূর্ণ করা নয়, তার আঞ্চলিক নেটওয়ার্ককে ভেঙে টুকরো করা নয়; বরং এই শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে গোটা অঞ্চলে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত করা। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইরানই নেতানিয়াহুর সেই স্বপ্নপূরণের পথে শেষ ও একমাত্র বাধা—ইসরায়েলের সীমানা সম্প্রসারণ এবং একটি নতুন আন্তর্জাতিক জোট প্রতিষ্ঠা, যাকে তিনি তথাকথিত ‘হেক্সাগন অব স্টেটস’ বলেন। এই জোটে ভারতের থাকবে পূর্ব প্রান্ত, আর সোমালিল্যান্ড হবে দক্ষিণের অগ্রভাগ।

এই জোট ইসরায়েলকে আঞ্চলিক সামরিক প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে, সারা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে তাদের বিমানঘাঁটি। যেসব বড় আরব রাষ্ট্র ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া কখনো ইসরায়েলকে সমর্থন করবে না, তাদের বাধ্য করা হবে নতুন বাস্তবতা মেনে নিতে—যেমন আজ সিরিয়ায়, কাল লেবাননে—নিজেদের ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্বের সংকোচন।

ভারতের সমর্থন নিশ্চিত হলে ইসরায়েল ওয়াশিংটনের অর্থায়ন, অস্ত্র ও রাজনৈতিক সমর্থনের ‘নাভিরজ্জু’ নির্ভরতা থেকে কিছুটা মুক্ত হবে। জনমত জরিপ যদি কোনো ইঙ্গিত দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎও নিশ্চয়তার নয়। ইসরায়েল জানে, গাজায় গণহত্যা পশ্চিমে তার ‘উদার প্রকল্প’ হিসেবে ভাবমূর্তিকে ধ্বংস করেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধই তাদের বিমা নীতি।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখন টিকে থাকার লড়াই করছে। যাদের প্রায়ই মৌলবাদী ও বেপরোয়া বলা হয়, সেই নেতৃত্ব বাস্তবে ছিল অতিমাত্রায় সতর্ক। তারা দেরিতে বুঝেছে, গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েল যে সর্বাত্মক ধ্বংসযুদ্ধ চালিয়েছে, তা একদিন তাদের দরজায়ও পৌঁছাবে। তারা দুবার আলোচনায় বসেছিল। প্রতিবারই যুক্তরাষ্ট্র সেই আলোচনা ব্যবহার করেছে সামরিক ‘ডিক্যাপিটেশন বা শিরশ্ছেদ’ অভিযানের আড়াল হিসেবে।

মারাত্মক ভুল

ইরানের বর্তমান সংকটের শিকড় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার প্রতিক্রিয়ায়। ইরান ও হিজবুল্লাহর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল উত্তর দিক থেকে ইসরায়েলে অনুপ্রবেশ করে একযোগে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলার জন্য কাসসাম ব্রিগেডের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা। ৭ অক্টোবরের পরিকল্পনা কেবল দক্ষিণের একটি সামরিক ঘাঁটিতে সীমিত হামলা ছিল না; এটি কল্পনা করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হিসেবে। কিন্তু হিজবুল্লাহ ও ইরান শুরুতে সম্পৃক্ত হতে অস্বীকৃতি জানালে, তারা নিজেদের একে একে ইসরায়েলের হাতে বিচ্ছিন্নভাবে আঘাতের সুযোগ করে দেয়।

ইরান মারাত্মক ভুল করেছিল। তারা এবং হিজবুল্লাহ যে বার্তা বাইডেন প্রশাসনের কাছ থেকে পাচ্ছিল, সেটি গুরুত্ব দিয়ে শুনেছিল। তিনি প্রতিক্রিয়া জানাতে সময় নিয়েছিলেন, কিন্তু যখন প্রতিক্রিয়া দিলেন, তখন প্রয়াত হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহ হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলাকে ‘শতভাগ ফিলিস্তিনি অভিযান’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তাঁর সংগঠন বা ইরান কেউই আগে থেকে জানত না কী ঘটতে যাচ্ছে—‘এর সঙ্গে কোনো আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক ইস্যুর সম্পর্ক নেই।’

তিনি যখন এ কথা বলছিলেন, তখন সীমান্তে সংঘর্ষে হিজবুল্লাহ ইতিমধ্যে ৫৭ জন সদস্য হারিয়েছে। অর্থাৎ তারা নিষ্ক্রিয় ছিল না। কিন্তু তারা নিজেদের ধীরে ধীরে ইসরায়েলের সময় নির্ধারিত যুদ্ধে টেনে নিতে দিয়েছে। ফলে হামাস, হিজবুল্লাহ এবং এখন ইরান—তিন পক্ষকেই একে একে বিচ্ছিন্নভাবে মোকাবিলা করা হয়েছে। তারা কেউই সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ নেয়নি।

অনেক দেরিতে হলেও ইরান এই শিক্ষাগুলো নিয়েছে। এখন তারা গত জুনে ১২ দিনের যে অভিযানে লিপ্ত ছিল, তার চেয়ে ভিন্ন এক প্রচারণা পরিচালনা করছে। এরপর ইরান তার সমস্ত শক্তি এক করে ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্রের পর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। আর আজ ইরানের প্রধান লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে তার মিত্ররা।

ইরানি ভাষ্যকার ত্রিতা পারসি এক্সে লিখেছেন, ‘তেহরান এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র সঙ্গে থাকলে ইসরায়েলের যন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষমতা খুব বেশি। তাই মনোযোগ ঘুরে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে...ইরান বুঝেছে, আমেরিকার নিরাপত্তা কর্তাদের অনেকেই মনে করতেন ইরানের আগের সংযম ছিল দুর্বলতার প্রতিফলন, কিংবা সরাসরি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হওয়ার অক্ষমতা বা অনীহা।’

তিনি আরও লেখেন, ‘তেহরান এখন ঠিক উল্টোটা প্রমাণ করতে সর্বস্ব উজাড় করে দিচ্ছে—যদিও এর জন্য তাকে ভয়াবহ মূল্য দিতে হবে। আয়রনি হলো, খামেনির হত্যাকাণ্ডই এই অবস্থান বদলের পথ সুগম করেছে।’

চড়া মূল্য

হামলা শুরু হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। দুবাইয়ে হামলা চালিয়েছে। সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার অচল করে দিয়েছে। দোহায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন ও রপ্তানি স্থগিত হয়েছে। উপসাগরের প্রবেশমুখে জাহাজে আগুন জ্বলছে। অধিকাংশ ফ্লাইট স্থগিত। তেল ও গ্যাসের দাম লাফিয়ে বেড়েছে।

ইরানি ড্রোন আবুধাবিতে একটি ফরাসি সামরিক ঘাঁটি এবং সাইপ্রাসে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের আকরোতিরি ঘাঁটিতেও হামলা চালিয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য আক্রমণটিকে যতটা সম্ভব ব্যয়বহুল করে তুলে ট্রাম্পের হামলাকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দিতে চাইছে ইরান।

নিরবচ্ছিন্ন ও ভারী গোলাবর্ষণের মুখেও উপসাগরীয় দেশগুলো—অন্তত এখন পর্যন্ত—উত্তেজনা আরও না বাড়ানোর পথেই রয়েছে। সৌদি আরব, কাতার ও ওমান কয়েক মাস ধরেই ট্রাম্পকে ইরানে হামলা না করার সতর্কবার্তা দিয়ে আসছিল। তিনি তাদের পরামর্শ উপেক্ষা করেছেন, আর এখন তারই মূল্য গুনছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম যখন গর্ব করে বলেছিলেন যে তিনি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে (এমবিএস) ইরানে হামলার পক্ষে ‘সমর্থন দিতে রাজি’ করিয়েছেন, বাস্তবে সৌদি যুবরাজ ঠিক উল্টো কাজই করছিলেন। তিনি উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের বলেছিলেন, এমন কোনো পদক্ষেপ না নিতে যা তেহরান বা তার মিত্রগোষ্ঠীর পাল্টা প্রতিক্রিয়া উসকে দিতে পারে এবং অঞ্চলকে বৃহত্তর সংঘাতে ঠেলে দিতে পারে।

রিয়াদের সতর্কতার যথেষ্ট কারণ আছে। উত্তর ইয়েমেনে হুতিদের সঙ্গে তারা যুদ্ধবিরতি বজায় রেখেছে, আর হুতিরা এখনো পর্যন্ত বড়ভাবে জড়িয়ে পড়েনি। কিন্তু গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার পরও হুতিরা এখনো কার্যকর যুদ্ধশক্তি। তাদের কাছে ২ হাজার কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং আকাশপথে ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে সক্ষম ড্রোন রয়েছে। একইভাবে ইরাকি মিলিশিয়াগুলোও সক্রিয়। ২০১৯ সালে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের আবকাইক ও খুরাইসে আরামকোর তেল স্থাপনাগুলোর ওপর যে ড্রোন হামলা হয়েছিল, সেগুলো উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল তাদের ভূখণ্ড থেকেই।

মানচিত্র নতুন করে আঁকার খেলা

উপসাগরীয় দেশগুলো কত দিন এই অবস্থান ধরে রাখতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কারণ ইরান পুরো গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলকেই উত্তেজনার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে তুলতে চাইছে। এখন ইরানের সামনে দুটি প্রধান দৃশ্যপট। হয় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বোমা অভিযান কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর সম্পূর্ণ পতন ঘটাবে এবং শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে—অথবা শাসনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে যুদ্ধকে সফলভাবে যুদ্ধবিরতির দিকে নিয়ে যাবে।

রমজান মাসে খামেনিকে হত্যা করা বরং ইরানি বিপ্লবকে নতুন প্রাণ দিতে পারে, সেটিকে নতুন লক্ষ্য ও অর্থ দিতে পারে। সেটাই হবে এক ধরনের বিজয়—কারণ ইরান জানে, এই যুদ্ধে দুর্বল কড়ি হলেন ট্রাম্প নিজেই। যদি ইরান দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে, তাহলে তা ট্রাম্পের মাগা সমর্থক ঘাঁটির ভেতরেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এতে উন্মোচিত হবে সেই বাস্তবতা যে ইসরায়েল ট্রাম্পকে এমন এক যুদ্ধে টেনে এনেছে, যা না তার সমর্থকদের দরকার ছিল, না যুক্তরাষ্ট্রের।

কিন্তু যদি ইরান ভেঙে পড়ে, তাহলে পুরো উপসাগর জুড়ে তার ধ্বংসাত্মক পরিণতি নিশ্চিত। ইরানে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে লাখো মানুষ পশ্চিমমুখী শরণার্থী হতে পারে। এবং নেতানিয়াহুর যুদ্ধ সেখানেই শেষ হবে না। আরব রাষ্ট্রগুলোর নিজেদের রক্ষা করার দুর্বলতার ওপরই বাজি ধরেছে ইসরায়েল, এবং তাদের আরও দুর্বল করে তুলতে চাইছে।

কারণ দুর্বল প্রতিবেশের মানচিত্র ঘিরেই ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নতুন করে আঁকতে পারবে, প্রতিষ্ঠা করতে পারবে এক নতুন সাইকস-পিকো চুক্তি। তারপর শুধু সময়ের অপেক্ষা, কখন নেতানিয়াহু তুরস্ককে ইসরায়েলের পরবর্তী ‘আমালেক’ হিসেবে ঘোষণা করেন।

মিডল ইস্ট আই–এর এডিটর ইন চিফ ও মধ্যপ্রাচ্য সংকট বিশেষজ্ঞ ডেভিড হার্স্টের লেখা থেকে অনুবাদ করেছে আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

আরও পড়ুন:

ট্রাম্পের যুদ্ধের মস্তিষ্ক হয়ে উঠছে এআই, বিপজ্জনক ভবিষ্যতের পথে বিশ্ব

ইরানের ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’: প্রতিবেশীদের আঙিনায় কেন বোমা ফেলছে তেহরান

ইরানে হামলায় এআই ব্যবহার করছেন ট্রাম্প, কোন পথে বিশ্ব

ইরানে ৪-৫ সপ্তাহ যুদ্ধ চালাতে চান ট্রাম্প, অস্ত্রের মজুতে কুলাবে কি

ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা আর কত দিন টিকবে

ইরানের ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ ধ্বংস করা সহজ নয়

কে হচ্ছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা—খামেনির ছেলে নাকি খোমেনির নাতি

যুক্তরাজ্যের অনুমতিতে ইরানে হামলায় মার্কিন বোমারু শক্তি ‘চার গুণ’ বাড়ছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতে ঘড়ি—কিন্তু সময় ইরানের পক্ষে

ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য তিন পরিণতি