টানা ৪১ দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সম্মিলিত শক্তি ও বলপ্রয়োগের নীতির মুখে ইরান আজ এক অপরাজেয় প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ‘বেঁধে রাখা পোষা প্রাণীর’ মতো ইরানকে বশ্যতা স্বীকার করাতে পশ্চিমা শক্তি যে স্থূল যুক্তি ও নিষ্ঠুর কৌশল নিয়েছিল, তা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান আজ কেবল টিকেই নেই, বরং তারা সামরিক, কৌশলগত ও কূটনৈতিক—প্রতিটি ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অক্ষকে পরাজিত করছে।
সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে চলা হত্যাযজ্ঞ ও সাম্রাজ্যবাদী দম্ভের পরও ইরানের মনোবল ভাঙতে পারেনি হোয়াইট হাউস। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের সভ্যতা ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছিলেন, তা ছিল মূলত একজন পরাজিত ও মরিয়া নেতার আস্ফালন। ট্রাম্প তাঁর ‘ম্যাডম্যান থিওরি’ বা উন্মাদ কূটনীতির মাধ্যমে ইরানকে ভয় দেখাতে চেয়েছিলেন, যাতে তেহরানের নেতারা পালিয়ে যান আর সাধারণ জনগণ আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু ইরানের গর্বিত জাতি ও তাদের দীর্ঘ ৫ হাজার বছরের ইতিহাস একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট বা বোমাবর্ষণে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি।
ইরান সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে ‘অ্যাট্রিশন’ বা ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের কৌশল অবলম্বন করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে সমানে সমান যুদ্ধজাহাজ বা যুদ্ধবিমান দিয়ে লড়াই করেনি, বরং যুদ্ধের ময়দানকে সীমানা ছাড়িয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য ছড়িয়ে দিয়েছে। ইরান আঘাত সয়েছে, কিন্তু এগিয়ে গেছে; তাদের নীতি ছিল সহজ—টিকে থাকো, পাল্টা আঘাত করো এবং যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করো। জালের মতো বিস্তৃত বা স্তরভিত্তিক কমান্ড ব্যবস্থার কারণে ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করেও এই ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা যায়নি। ইরান আজ প্রমাণ করেছে—তারা ‘শত্রুর সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা’ শত্রুর চেয়েও ভালো বোঝে।
এ ছাড়া ভৌগোলিক বাস্তবতাকে ইরান একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশ্বের মোট তরল পেট্রোলিয়ামের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রবাহিত হয়, যার নিয়ন্ত্রণ সরাসরি ইরানের হাতে। এর মাধ্যমে ইরান বিশ্ব অর্থনীতির একটি চাবি নিজের পকেটে রেখেছে। তেহরান জানে, স্থায়ীভাবে এই পথ বন্ধ করা তাদের নিজেদের অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর, কিন্তু এটি বন্ধ করার ‘সক্ষমতা’ ধরে রাখাই তাদের আসল জয়। এর ফলে পশ্চিমা শক্তি ও এশিয়ার জ্বালানিনির্ভর দেশগুলোর কাছে তেহরান আজ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার এক অপরিহার্য স্থপতিতে পরিণত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন। কিন্তু যুদ্ধ এই রাষ্ট্রকে আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে। মানুষ এখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে ‘মুক্তিদাতা’ নয়, বরং ‘দখলদার’ হিসেবে দেখছে। যখন ওয়াশিংটন অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও সাদা-কালো দ্বন্দ্বে বিভক্ত এবং ইসরায়েল কর্তৃত্ববাদী শাসনে নিমজ্জিত, তখন ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও দৃঢ় ও সুসংহত অবস্থানে রয়েছে।
কূটনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র আজ বিচ্ছিন্ন। ট্রাম্পের অনভিজ্ঞতা ও খামখেয়ালি আচরণ তাঁর কাছের মিত্রদেরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে ইরান পূর্বের শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে এবং চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে নিজেদের অবস্থান মজবুত করেছে। ট্রাম্প যখন একের পর এক হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন, ইরান তখন দীর্ঘমেয়াদি খেলা খেলেছে। ফলে পশ্চিমা বিশ্বের সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের কৌশল এখন উল্টো তাদের জন্য ‘সর্বোচ্চ ব্যয়বহুল’ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
তবে এই জয় কোনো বিজয়োল্লাস বা প্যারেডের উৎসব নয়, এটি ছাই আর হাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। এই যুদ্ধের মানবিক মূল্য অপরিসীম, যা পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত বইতে হবে। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু, পঙ্গুত্ব ও নির্ভুল মারণাস্ত্রের আঘাতে প্রাণ হারানো অসংখ্য স্কুলশিক্ষার্থীর রক্তে এই জয় রঞ্জিত। অক্ষশক্তি ইরানের মেরুদণ্ড ভাঙতে না পারলেও ইরানিদের হৃদয় ভেঙে দিয়েছে। যুদ্ধের চিরন্তন সত্য এটাই—এখানে বিজয়ী কেবল তারাই, যারা ধ্বংসস্তূপের উত্তরাধিকার লাভ করে।
লেখক: অ্যান্ড্রু মিত্রোভিকা, আল জাজিরার জ্যেষ্ঠ কলাম লেখক
আল জাজিরা ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত