হোম > বিশ্লেষণ

সরকার বদলানো সহজ, চাকরি পাওয়া কঠিন—বাংলাদেশে জেন-জির হতাশা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

আবু সাঈদ নিহত হওয়ার ঘটনা ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনকে সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলনে রূপ দেয়। ছবি: ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল

২০২৪ সালের জুলাইয়ে চাকরির সংকটে হতাশ বাংলাদেশের তরুণেরা যখন রাস্তায় নামেন, তখন ২৫ বছর বয়সী ফারুক আহমেদ শিপনও তাঁদের সঙ্গে ছিলেন। ওই আন্দোলন এত দ্রুত বিস্তার লাভ করে যে শেষ পর্যন্ত প্রায় ১৫ বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটায়। পরবর্তীতে বাংলাদেশের তরুণদের এই সাফল্য নেপাল, ইন্দোনেশিয়া ও মাদাগাস্কারসহ আরও কয়েকটি দেশের আন্দোলনে অনুপ্রেরণা জোগায়।

কিন্তু সেই ‘জেন জি বিপ্লব’-এর পর জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে শিপনের মতো বহু তরুণের মনে এখন হতাশা। স্নাতকোত্তর শেষ করার এক বছর পরও তিনি চাকরি পাননি। শিপন বলেন, ‘আমার প্রথম চাওয়া একটি চাকরি। টাকা থাকলে অনেক স্বপ্ন দেখা যায়। কিন্তু টাকা না থাকলে খাব কী? পরব কী? থাকব কোথায়?’

শিপনের মতো অনেক তরুণ ভেবেছিলেন, হাসিনার পতনের পর গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হবে এবং অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে লাখো বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক এখন অন্য সময়ের তুলনায় সবচেয়ে কঠিন চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন।

এদিকে হাসিনার পতনের পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও সমালোচকদের মতে দৃশ্যমান অগ্রগতি কম। ছাত্রনেতাদের কেউ কেউ নতুন সরকারে যোগ দিয়ে পরে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন, কিন্তু তরুণদের জীবনে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারেননি।

এমন পরিস্থিতিতেই আগামীকাল (১২ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় এবার মূল লড়াই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামের মধ্যে। এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছে। কিন্তু এই বিষয়টি আবার নারী অধিকার ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার প্রশ্নে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

নির্বাচনপূর্ব সময়ে সহিংসতাও ঘটেছে। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বেড়েছে—বিশেষ করে হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে। ডিসেম্বরে ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত এক ছাত্রনেতা নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। একই মাসে এক হিন্দু শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটে।

তবে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের আগে থেকেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হচ্ছিল। দুর্নীতি, দুর্বল অবকাঠামো ও জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে মোট কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় ২০ লাখ। আরও প্রায় ৮ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাকশিল্পেও কর্মসংস্থান কমেছে। ২০১৯ সালে যেখানে এ খাতে ৪১ লাখ কর্মী ছিলেন, গত বছর তা নেমে এসেছে ৩৭ লাখে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে। প্রতিবছর অন্তত ৭ লাখ স্নাতক শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। কিন্তু ব্যবসায়ীদের মতে, অনেকেই ব্যবহারিক দক্ষতা ছাড়া ডিগ্রি অর্জন করছেন।

ঢাকার পোশাক উদ্যোক্তা আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, ‘এত ইতিহাসের ছাত্র আমাদের দরকার নেই। চাকরির সঙ্গে মিলছে না।’

তিনি তাঁর চারটি কারখানা ও তিনটি টেক্সটাইল মিলে ১১ হাজার ৫০০ কর্মী নিয়োগ দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের বদলে তিনি কারিগরি শিক্ষাপ্রাপ্ত কর্মী নিয়োগেই বেশি আগ্রহী।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের বেকার জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশ (প্রায় ৯ লাখ) বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক। ২০২৪ সালে স্নাতকদের বেকারত্বের হার প্রায় ১৪ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ছিল ৫ শতাংশ। বিপরীতে, কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন বেকারত্বের হার মাত্র ১.৩ শতাংশ।

শিপন ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর শেষ করার পর স্কুল, ব্যাংক ও একটি গ্রামীণ ইউটিলিটি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেও কাজ পাননি। বর্তমানে তিনি ইংরেজি পড়িয়ে ও টিউশনি করে মাসে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা আয় করেন।

এর অর্ধেক খরচ হয় মায়ের চিকিৎসার পেছনে। আর বাকি অর্ধেক দুই কক্ষের টিনশেড রুমের ভাড়া, খাবার ও ওষুধে। এদিকে গত বছর তিনি তাঁরই এক সহপাঠীকে বিয়ে করেছেন, কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তারা একসঙ্গে থাকতে পারছেন না।

২০২৪ সালে শিপন প্রথম রাস্তায় নামেন সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে। পরে পুলিশ গুলিতে তাঁর সহপাঠী আবু সাঈদ নিহত হওয়ার ঘটনা আন্দোলনকে সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলনে রূপ দেয়।

আজ শিপনের আশঙ্কা—আবু সাঈদের মতো আন্দোলনকারীদের ত্যাগ কি তবে অর্থহীন হয়ে গেল?

শিপন এখন দেশের ভবিষ্যৎ নিয়েই আস্থা হারাচ্ছেন। তাঁর স্বপ্ন—সুইডেন বা সুইজারল্যান্ডে স্থায়ীভাবে চলে যাওয়া। তাঁর অনেক বন্ধুও বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

তিনি বলেন, ‘পেছনে তাকালে আমি শুধু হতাশ হই। শুধু শেখ হাসিনা বদলেছেন। বাকিটা একই আছে। যদি শুধু একজন মানুষ বদলায়, তাহলে বিপ্লবের অর্থ কী?’

ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল থেকে সংক্ষেপে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা

খাদের কিনারায় পাকিস্তান: ইরান যুদ্ধে মধ্যস্থতার ঝুঁকি নাকি বৈশ্বিক পুনরুত্থানের সুযোগ

হরমুজ উন্মুক্ত না করেই যুদ্ধ শেষ করতে চান ট্রাম্প, কেন এই পিছু হটা

হরমুজ আর ইরানের দ্বীপগুলো নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের যেসব বাণী ফলে যাচ্ছে

ব্যাপক হামলার পরও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দমানো সম্ভব নয় যেসব কারণে

ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে কেন ব্যর্থ ইসরায়েল

সুয়েজ খালে ডুবেছিল ব্রিটিশরা, হরমুজে মার্কিনদের জন্য কী অপেক্ষা করছে

ইরানের হামলায় ধ্বংস ‘ই-৩জি সেন্ট্রি’—যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কত বড় ক্ষতি

ইরানে মার্কিন স্থল আগ্রাসনের সম্ভাবনা কেন বেশি—ব্যাখ্যা করলেন ড. ডুমখ্যাত রুবিনি

পৃথিবীকে অবশ্যম্ভাবী পরমাণু যুদ্ধ থেকে বাঁচানো এক অজানা নায়ক

বিশ্ববাণিজ্যের ধমনি শুধু হরমুজ নয়, পানামা-মালাক্কাও সংকটের মুখে